‘জম্বির মতো ডাইভ দিতাম, প্রতি রাতে কাঁদতাম’: আঙুল ভেঙেও যেভাবে আর্জেন্টিনার জন্য লড়েছিলেন মার্তিনেজ

‘জম্বির মতো ডাইভ দিতাম, প্রতি রাতে কাঁদতাম’: আঙুল ভেঙেও যেভাবে আর্জেন্টিনার জন্য লড়েছিলেন মার্তিনেজ
‘জম্বির মতো ডাইভ দিতাম, প্রতি রাতে কাঁদতাম’: আঙুল ভেঙেও যেভাবে আর্জেন্টিনার জন্য লড়েছিলেন মার্তিনেজ
একজন গোলকিপারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাঁর হাত। গোল বাঁচাতে যে হাত মুহূর্তের ভগ্নাংশে বলের গতিপথ বদলে দেয়, সেই হাতের একটি আঙুলই যদি ভেঙে যায়, তাহলে প্রতিটি সেভ হয়ে ওঠে আলাদা এক যুদ্ধ।
এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ সেই যুদ্ধ করেছেন।
শুধু ব্যথা সহ্য করে নয়, অস্ত্রোপচার করলে বিশ্বকাপই মিস করতে হবে—এমন বাস্তবতা জেনেও তিনি মাঠে নেমেছিলেন। এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্যও দিতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর নিজের ভাষায়, আঙুলটি আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না। তবু অনুশোচনা নেই। জাতীয় দলের জন্য আবারও একই ঝুঁকি নিতেন তিনি।
ইউরোপা লিগ ফাইনালের আগে শুরু
চোটটির শুরু ২০২৬ সালের মে মাসে। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ফ্রাইবুর্গের বিপক্ষে ইউরোপা লিগ ফাইনালের আগে ওয়ার্মআপের সময় ডান হাতের আঙুলে চোট পান মার্তিনেজ।
প্রথমে বুঝতে পারেননি চোটটা কতটা গুরুতর। পরে হাসপাতালে স্ক্যান করানোর পর জানতে পারেন, আঙুলটি ভেঙে গেছে। তখনই সামনে চলে আসে বড় প্রশ্ন—বিশ্বকাপে কি খেলতে পারবেন?
মার্তিনেজ পরে জানিয়েছেন, এক্স-রে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল বিশ্বকাপই হয়তো শেষ। জাতীয় দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য তখন তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং তাঁকে বিশ্বকাপের দলে রাখার ব্যাপারে সমর্থন দেন।
অস্ত্রোপচার নয়, বিশ্বকাপ
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী অস্ত্রোপচার করলে আঙুল স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তাতে দীর্ঘ পুনর্বাসন দরকার হতো, ফলে বিশ্বকাপ খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।
মার্তিনেজ তাই অন্য পথ বেছে নেন।
আর্জেন্টিনার মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত অস্ত্রোপচার না করে বিশেষ সুরক্ষা নিয়ে খেলবেন। অ্যাডিডাস তাঁর জন্য বিশেষভাবে তৈরি করে গ্লাভস। আঙুলে দেওয়া হয় প্লাস্টিকের সাপোর্ট ও ভারী ব্যান্ডেজ।
কিন্তু সেই সুরক্ষারও মূল্য ছিল। গ্লাভস ও ব্যান্ডেজের কারণে বল ধরার স্বাভাবিক অনুভূতি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। এমনকি বিশ্বকাপের বড় একটা অংশে স্বাভাবিক ফুটবল দিয়ে অনুশীলনও করতে পারেননি তিনি; ভলিবল দিয়ে অনুশীলনের কথা জানিয়েছেন মার্তিনেজ।
‘জম্বির মতো ডাইভ দিতাম’
আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গাস্তন এদুলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন মার্তিনেজ।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ম্যাচের আগের দিনও তিনি এক হাত দিয়ে ডাইভ দেওয়ার অনুশীলন করছিলেন।
তাঁর ভাষায়, তিনি তখন ‘জম্বির মতো’ ডাইভ দিতেন। ডান হাত মাটিতে রাখলেই চোখে তারা দেখতেন। ব্যথা এতটাই তীব্র ছিল যে প্রায় প্রতিরাতেই কাঁদতেন তিনি। ফুলে যাওয়া আঙুলটিকে তাঁর কাছে সসেজের মতো মনে হতো।
গোলকিপারের জন্য এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতি কল্পনা করা কঠিন।
বিশ্বকাপজুড়ে ব্যথা, তবু থামেননি
চোট নিয়েই পুরো বিশ্বকাপ খেলেছেন মার্তিনেজ। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠেছিল, যদিও স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে রানার্সআপ হয়।
টুর্নামেন্টে তাঁর চোটের প্রভাবও ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের। মার্তিনেজ জানিয়েছেন, আঙুলের সমস্যা তাঁর পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব ফেলেছিল। তবু দেশের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে মাঠে ছিলেন তিনি।
অস্ত্রোপচার করলে হয়তো আঙুলটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সুযোগ ছিল। কিন্তু তখন বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকত না।
মার্তিনেজ বেছে নিয়েছিলেন দেশকে।

চোটের প্রভাব পড়ল ক্লাব ক্যারিয়ারেও
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও আঙুলের সমস্যা কাটেনি।
পরবর্তীতে এক্স-রে করানোর পর দেখা যায়, আঙুলটি আবার ভেঙে গেছে। এই চোটের কারণেই ইতালিতে তাঁর সম্ভাব্য দলবদর ভেস্তে যায় বলে মার্তিনেজ জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে জুভেন্টাসের নাম এসেছে।
শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭৫ লাখ পাউন্ডে অ্যাস্টন ভিলা থেকে চেলসিতে যোগ দেন তিনি।
চেলসির মেডিক্যাল টিমও জানত, আঙুলটির অস্ত্রোপচার একসময় করাতেই হবে। কিন্তু ক্লাবটি তাঁকে চোট নিয়েই খেলার সুযোগ দেয়। মার্তিনেজের ভাষায়, ‘একদিন আমার অস্ত্রোপচার করাতেই হবে।’
‘আবারও একই ঝুঁকি নেব’
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, এত কিছুর পরও মার্তিনেজের কোনো অনুশোচনা নেই।
তিনি জানেন, আঙুলটি আর কখনো পুরোপুরি আগের মতো হবে না। এখনো ব্যথা নিয়ে খেলতে হয়। হাত পুরোপুরি বন্ধ করতেও পারেন না তিনি।
তবু জাতীয় দলের জন্য আবারও একই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন মার্তিনেজ।
‘জাতীয় দলের জন্য এমন ঝুঁকি নিতেই হয়। আবারও একই কাজ করব’—তাঁর বক্তব্যের সারকথা এটাই।
আঙুলের পর এবার চোয়াল
মার্তিনেজের শরীর অবশ্য এখন আরও একটি বড় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অক্টোবরে এভারটনের বিপক্ষে চেলসির ২-০ জয়ের ম্যাচে এভারটনের ডিফেন্ডার জ্যারাড ব্র্যাথওয়েটের সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁর চোয়াল ভেঙে যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর অস্ত্রোপচার করতে হয়।
এই চোটের কারণে এখন পুনর্বাসনে আছেন তিনি। চেলসি কোচ জানিয়েছেন, দ্রুত ফেরার জন্য মুখে বিশেষ মাস্ক ব্যবহারের প্রস্তুতিও চলছে।
চোয়ালের চোট একসময় সেরে যাবে। কিন্তু আঙুলের গল্পটা আলাদা।
সেই ক্ষত শরীরে থেকে যাবে।
দেশের জন্য এক গোলকিপারের অসম্ভব আত্মত্যাগ
ফুটবলে দেশের জন্য চোট নিয়ে খেলার গল্প নতুন নয়। কিন্তু মার্তিনেজের ঘটনাটির নির্মমতা অন্য জায়গায়।
যে হাত দিয়ে তাঁকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল বাঁচাতে হয়েছে, সেই হাতের স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা জেনেও তিনি থামেননি।
একজন গোলকিপারের কাছে হাত মানে শুধু শরীরের একটি অঙ্গ নয়—সেটিই তাঁর পেশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
মার্তিনেজ সেই অস্ত্রের একটি অংশকে ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন একটি স্বপ্নের জন্য।
বিশ্বকাপ তিনি জিততে পারেননি।
কিন্তু দেশের জন্য কতটা যেতে পারেন একজন ফুটবলার—তার গল্পে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের এই অধ্যায়টি থেকে যাবে অনেক দিন।












