Image

মেসি-রোনালদো নেই, তবু উত্তাপ কমছে না এল ক্লাসিকোর: যে ৫ লড়াইয়ে চোখ থাকবে

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 1 ঘন্টা আগেআপডেট: 1 সেকেন্ড আগে
মেসি-রোনালদো নেই, তবু উত্তাপ কমছে না এল ক্লাসিকোর: যে ৫ লড়াইয়ে চোখ থাকবে

মেসি-রোনালদো নেই, তবু উত্তাপ কমছে না এল ক্লাসিকোর: যে ৫ লড়াইয়ে চোখ থাকবে

মেসি-রোনালদো নেই, তবু উত্তাপ কমছে না এল ক্লাসিকোর: যে ৫ লড়াইয়ে চোখ থাকবে

সময় বদলায়, বদলে যায় ফুটবলের নায়কও। একসময় এল ক্লাসিকো মানেই ছিল লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ। মেসির বাঁ পায়ের জাদু, রোনালদোর দুরন্ত গতি, আর ডাগআউটে পেপ গার্দিওলা ও জোসে মরিনিওর কৌশলগত লড়াই—সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে দিত এই মহারণ।

সেই সময় পেরিয়ে এসেছে নতুন প্রজন্ম। বার্সেলোনার লামিনে ইয়ামাল আর রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প। তাঁদের লড়াই এখনো দীর্ঘ ইতিহাসের অপেক্ষায় থাকলেও এল ক্লাসিকোর উত্তেজনায় কোনো ঘাটতি নেই।

আগামীকাল রাতে ক্যাম্প ন্যুতে মুখোমুখি হওয়ার কথা বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের। লা লিগায় ৯ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বার্সেলোনা। সমান ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল। এই ম্যাচে হারলে শিরোপার দৌড়ে দুই দলের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৯ পয়েন্টে।

হান্সি ফ্লিকের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীকে অনেকটা পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ। অন্যদিকে, রিয়ালের ডাগআউটে জোসে মরিনিওর সামনে ব্যবধান কমিয়ে শিরোপার লড়াই জমিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ।

মহারণের আগে আলোচনায় রয়েছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

১. রাফিনিয়ার পায়েই কি জয়ের চাবি?

পরিসংখ্যান কখনো কখনো ফুটবলের সম্ভাব্য গল্পের ইঙ্গিত দেয়। রাফিনিয়ার ক্ষেত্রে সেটিই যেন সত্যি। ব্রাজিলিয়ান তারকা খেলেছেন, এমন সর্বশেষ ছয় এল ক্লাসিকোর প্রতিটিতেই জিতেছে বার্সেলোনা। এই ম্যাচগুলোতে রাফিনিয়া করেছেন ৭ গোল, সঙ্গে রয়েছে ৩টি অ্যাসিস্ট।

চলতি মৌসুমেও দুর্দান্ত ছন্দে আছেন তিনি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন ১৪ গোল। লিগে ৮ ম্যাচে ১২ গোল করে রয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষে।

চোট কাটিয়ে প্যারিস সাঁ-জার্মেইয়ের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে ফিরেছিলেন রাফিনিয়া। বার্সেলোনা সেই ম্যাচে হারলেও ব্রাজিলিয়ান তারকার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেনি। তাঁর বিশ্বাস, ওই হার এল ক্লাসিকোর পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

রিয়ালের বিপক্ষে রাফিনিয়ার অতীত রেকর্ড ও বর্তমান ফর্ম বার্সেলোনার জন্য বড় আশার জায়গা। তিনি জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হতে পারে।

২. মরিনিওর পুরোনো রূপ কি ফিরবে?

ফুটবলের ইতিহাসে জোসে মরিনিও ও বার্সেলোনার সম্পর্ক বেশ নাটকীয়। একসময় বার্সেলোনার সহকারী কোচ ছিলেন পর্তুগিজ এই কোচ। পরে রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নিয়ে হয়ে ওঠেন বার্সার অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।

২০১১ সালের স্প্যানিশ সুপার কাপের সেই বিতর্কিত মুহূর্ত এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে আছে। বার্সার তৎকালীন সহকারী কোচ তিতো ভিয়ানোভার চোখে আঙুল দিয়েছিলেন মরিনিও। ঘটনাটি দুই দলের বৈরিতার আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে।

এবার আবার রিয়ালের ডাগআউটে মরিনিও। দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর সামনে প্রথম এল ক্লাসিকো। বয়সের সঙ্গে তাঁর আচরণে কিছুটা পরিবর্তন এলেও বড় ম্যাচে তাঁর কৌশল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মানসিকতা থাকবে আলোচনায়।

রিয়ালের কোচ হিসেবে প্রথম মেয়াদে ১৭টি এল ক্লাসিকোয় মরিনিওর জয় ছিল ৫টি, ড্র ৬টি এবং হার ৬টি। ২০১৩ সালে ক্লাব ছাড়ার আগে টানা পাঁচটি ক্লাসিকোয় অপরাজিত ছিলেন তিনি। এবার সেই ধারাকে ছয় ম্যাচে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

অন্যদিকে, বার্সার কোচ হান্সি ফ্লিকের এল ক্লাসিকো রেকর্ডও উল্লেখযোগ্য। সাত ম্যাচে ছয় জয় পেয়েছেন তিনি। ফলে দুই কোচের লড়াইয়ে কৌশল, অভিজ্ঞতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

৩. ক্যাম্প ন্যু কি রিয়ালের দুঃস্বপ্ন হবে?

নিজেদের মাঠে বার্সেলোনার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স প্রতিপক্ষের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ঘরের মাঠে টানা ২৩টি লিগ ম্যাচে জয়ের ধারায় রয়েছে দলটি। গত মৌসুমে নিজেদের মাঠে ১৯টি লিগ ম্যাচের সব কটিতেই জিতেছিল বার্সা। চলতি মৌসুমেও প্রথম চার ম্যাচে জয় পেয়েছে তারা।

ঘরের মাঠে গোল করার ক্ষেত্রেও দুর্দান্ত বার্সেলোনা। এ মৌসুমে সেখানে পাঁচ ম্যাচে ২২ গোল করেছে দলটি, অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি চারটিরও বেশি।

অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের সাম্প্রতিক অ্যাওয়ে ফর্মে কিছুটা অস্থিরতা রয়েছে। সর্বশেষ চার লিগ অ্যাওয়ে ম্যাচে দুটি জয় ও দুটি হার তাদের। রিয়াল বেতিস ও আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হেরেছে দলটি; জয় পেয়েছে এস্পানিওল ও এলচের বিপক্ষে।

তবে ইতিহাস বলছে, ক্যাম্প ন্যুতে রিয়ালকে একেবারে অসহায় ভাবার সুযোগ নেই। বার্সার মাঠে সর্বশেষ ছয় লিগ ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে মাদ্রিদের দলটি। এর আগের ১৬ ম্যাচে তাদের জয় ছিল তিনটি।

অর্থাৎ, ঘরের মাঠে বার্সেলোনা শক্তিশালী হলেও রিয়াল জানে কীভাবে সেখানে জয়ের পথ খুঁজে নিতে হয়।

বার্সেলোনার অনুশীলনে রাফিনিয়া

৪. বার্সেলোনার রক্ষণ কি সত্যিই নিরাপদ?

আক্রমণভাগে বার্সেলোনার গোল করার ক্ষমতা নজরকাড়া। ১২ ম্যাচে ৫০ গোল করেছে দলটি। পিএসজির কাছে ৪-২ গোলে হারের আগে টানা ১১ ম্যাচে জিতেছিল ফ্লিকের দল।

তবে প্যারিসের ক্লাবটি দেখিয়েছে, বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ফুটবলের আড়ালেও দুর্বলতা রয়েছে। ফ্লিকের উচ্চচাপের কৌশল প্রতিপক্ষকে দ্রুত বল হারাতে বাধ্য করে। লিগে প্রতি ম্যাচে গড়ে মাত্র ৬.৮টি শট হজম করেছে বার্সেলোনা—যা তাদের রক্ষণাত্মক সংগঠনের শক্তির ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু প্রতিপক্ষের শট থেকে গোল হওয়ার সম্ভাবনার হিসাবে ছবিটি ভিন্ন। দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের প্রতিটি শটের বিপরীতে প্রত্যাশিত গোল বা এক্সপেক্টেড গোল (xG) মান লিগে সর্বোচ্চ বার্সেলোনার। অর্থাৎ, তারা তুলনামূলক কম শটের সুযোগ দিলেও প্রতিপক্ষ সুযোগ পেলে সেটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

চোটের কারণে জুলস কুন্দের অনুপস্থিতিও বার্সার রক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন এমবাপ্পে ও ইয়ান দিওমান্দের মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা।

৫. ভিনিসিয়ুসের অভাব কি টের পাবে রিয়াল?

বড় ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি সব সময়ই চিন্তার বিষয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র না থাকলেও রিয়াল মাদ্রিদের আক্রমণে বিকল্পের অভাব নেই।

ভিনিসিয়ুসের জায়গায় ইয়ান দিওমান্দের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়তে পারে। সেভিয়ার বিপক্ষে রিয়ালের তিনটি গোলই এসেছিল বাঁ প্রান্ত দিয়ে। সেভিয়া ও লাইপজিগের বিপক্ষে গোল ও অ্যাসিস্ট করে দিওমান্দেও নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন।

আর আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। বার্সেলোনার বিপক্ষে ছয় ম্যাচে ছয় গোল করেছেন ফরাসি তারকা—গড়ে প্রতি ৭৫ মিনিটে একটি গোল। তাঁর গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং পাল্টা আক্রমণে কার্যকারিতা বার্সার রক্ষণকে চাপে ফেলতে পারে।

জুড বেলিংহামের পরিসংখ্যানও রিয়ালের জন্য আশাব্যঞ্জক। ছয়টি এল ক্লাসিকোয় তাঁর গোল চারটি, অ্যাসিস্ট দুটি। এর মধ্যে তিনটি গোল এসেছে ম্যাচ জেতানো পরিস্থিতিতে।

ফলে ভিনিসিয়ুসের অনুপস্থিতি রিয়ালের জন্য বড় ধাক্কা হলেও এমবাপ্পে ও বেলিংহামের মতো খেলোয়াড়দের উপস্থিতি বার্সেলোনার জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

ইতিহাসের হিসাবেও সমানে-সমান

এল ক্লাসিকোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু বর্তমান ফর্ম বা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়; দুই দলের দীর্ঘ ইতিহাসও ম্যাচটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দলের জয় ১০৬টি করে, ড্র ৫২টি। গোলসংখ্যায় রিয়াল মাদ্রিদ এগিয়ে—৪৪৪ গোল, বার্সেলোনার গোল ৪৪১টি।

এবার লিগে টানা নয়টি জয় দিয়ে ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে মিগুয়েল মুনোজের রিয়াল মাদ্রিদের গড়া সেরা শুরুর রেকর্ড ছুঁয়েছে বার্সেলোনা। আরেকটি জয় পেলেই রেকর্ডটি এককভাবে নিজেদের করে নেওয়ার সুযোগ থাকবে তাদের সামনে।

একদিকে মরিনিওর সামনে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজের ছাপ রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে ফ্লিকের সামনে বার্সেলোনার আধিপত্য আরও শক্তিশালী করার সুযোগ।

মেসি নেই, রোনালদোও নেই। তবু এল ক্লাসিকোর উত্তেজনা অটুট। কারণ, ফুটবলার বদলায়, কোচ বদলায়, যুগ বদলায়—কিন্তু বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের দ্বৈরথের আবেদন সহজে ফুরায় না।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three