Image

এক ম্যাচেই শেষ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন, মিলি সভিলারের করুণ গোলকিপিং গল্প

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 2 ঘন্টা আগেআপডেট: 41 মিনিট আগে
এক ম্যাচেই শেষ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন, মিলি সভিলারের করুণ গোলকিপিং গল্প

এক ম্যাচেই শেষ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন, মিলি সভিলারের করুণ গোলকিপিং গল্প

এক ম্যাচেই শেষ আন্তর্জাতিক স্বপ্ন, মিলি সভিলারের করুণ গোলকিপিং গল্প

কিছু ফুটবল ম্যাচ ইতিহাসে জায়গা করে নেয় জয়-পরাজয়ের কারণে। আবার কিছু ম্যাচ কোনো খেলোয়াড়ের জীবনে এমনভাবে ছাপ ফেলে যায়, যা সময় পেরিয়েও মুছে যায় না। মিলি সভিলারের জন্য ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বরের সেই ম্যাচটি ঠিক তেমনই।

হাঙ্গেরির দেব্রেচেনে কাতারের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নেমেছিল সার্বিয়া। ম্যাচটি ছিল স্রেফ একটি প্রীতি ম্যাচ। সার্বিয়া জিতেছিল ৪-০ গোলে। পাঁচ বছর পর ম্যাচটির কথা মনে থাকার কথা নয় কারও। কিন্তু সভিলারের জন্য সেটিই হয়ে আছে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়।

বিরতির সময় প্রেদ্রাগ রাইকোভিচের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ২২ বছর বয়সী সভিলার। সার্বিয়ার হয়ে সেটিই ছিল তাঁর অভিষেক। তখন কে জানত, সেই ৪৫ মিনিটই হয়ে থাকবে তাঁর জাতীয় দলের হয়ে শেষবার মাঠে নামার মুহূর্ত!

সেই ম্যাচের পর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের আরও চারটি ম্যাচের স্কোয়াডে ছিলেন সভিলার। কিন্তু এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। এরপর আর কখনো সার্বিয়ার জার্সিতে খেলেননি তিনি।

আজ ২৭ বছর বয়সে এসে সভিলারের আন্তর্জাতিক ম্যাচসংখ্যা এখনো সেই একটিই।

অথচ ক্লাব ফুটবলে তাঁর গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন। রোমার গোলবারে দাঁড়িয়ে গত মৌসুমে সিরি ‘আ’র সেরা গোলকিপারের পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ইউরোপের অন্যতম প্রতিভাবান গোলরক্ষক হিসেবেও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু জাতীয় দলের ক্ষেত্রে সেই প্রতিভার গল্পটা যেন আটকে আছে দেব্রেচেনের ওই বুধবার সন্ধ্যায়।

বাবার দেশ বেছে নেওয়া

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সভিলারের ফুটবল পরিচয় অবশ্য ছোটবেলা থেকেই ছিল। তাঁর বাবা রাতকো সভিলার যুগোস্লাভিয়ার হয়ে ফুটবল খেলেছেন। বাবার পথ অনুসরণ করেই গোলবারের নিচে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন মিলি।

বেলজিয়ামের জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। কিন্তু তখন গোলবারের সামনে ছিলেন থিবো কোর্তোয়া। ২০২১ সালে ২৯ বছর বয়সী কোর্তোয়া তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার এবং বেলজিয়ামের এক নম্বর হিসেবে ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সভিলার ও তাঁর বাবা সম্ভবত বুঝেছিলেন, বেলজিয়ামের জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া সহজ হবে না। সিনিয়র দলে ডাক না পেলেও যুব পর্যায়ে বেলজিয়ামের হয়ে ২৬টি ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি।

এরপর ২২ বছর বয়সে সার্বিয়ার প্রস্তাব আসে। বাবার দেশ, নিজের শিকড় এবং জাতীয় দলে খেলার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন ফেডারেশন বদলের।

কিন্তু নতুন দেশেও অপেক্ষা করছিল অন্য এক দেয়াল।

সার্বিয়াতেও জায়গা হলো না

সার্বিয়ার গোলবার তখন রাইকোভিচের দখলে। তাঁর পেছনে ছিলেন ভানিয়া মিলিঙ্কোভিচ-সাভিচ। বছরের পর বছর এই দুজনের মধ্যেই মূলত গোলকিপারের জায়গাটি ঘুরেছে।

ফেডারেশন বদলের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সভিলারের প্রত্যাশা ছিল, এবার হয়তো জাতীয় দলের এক নম্বর হওয়ার পথ খুলবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

দেব্রেচেনের সেই ম্যাচের পর জাতীয় দলের দরজায় তাঁর অবস্থান ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

তবু চেষ্টা থামাননি সভিলার।

২০২২ সালে বেনফিকা থেকে ইতালিতে যাওয়ার পরও ফিফার কাছে ফেডারেশন বদলের অনুমতি চেয়ে যেতে থাকেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আবার বেলজিয়ামের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়া।

২০২৪ সালের বসন্তে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ দোমেনিকো তেদেস্কো বলেছিলেন, তারা কয়েক মাস ধরে সভিলারকে অনুসরণ করছেন। কিন্তু নিয়মের কারণে তিনি বেলজিয়ামের হয়ে খেলতে পারবেন না।

অর্থাৎ বেলজিয়ামও তাঁকে নিয়ে ভাবছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তের পথ তখন প্রায় বন্ধ।

কোর্তোয়ার চোট, তবু সুযোগ এলো না

সবচেয়ে নির্মম মুহূর্তটি সম্ভবত এসেছিল ২০২৬ বিশ্বকাপে।

স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন কোর্তোয়া। ৭১ মিনিটে তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন সেনে লামেন্স।

সভিলারের জায়গায় যদি অন্য কোনো সময়ের কথা ভাবা হয়, সেটি হতে পারত এই মুহূর্ত।

কিন্তু তিনি তখন বেলজিয়ামের জার্সি পরতে পারেননি।

ম্যাচের শেষ দিকে লামেন্সের ভুল থেকে স্পেন এগিয়ে যায় ২-১ গোলে। শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচ জিতে পরে বিশ্বকাপও ঘরে তোলে স্পেন।

টেলিভিশনের সামনে বসে সেই দৃশ্য দেখলে সভিলারের মনে কী চলছিল, তা কেবল তিনিই জানেন। হয়তো মনে হয়েছিল—ওই ৭১ মিনিটে মাঠে নামার কথা তো তাঁরই ছিল।

‘ওয়ান-ওয়ে রুল’-এর দেয়াল

সার্বিয়ার হয়ে আর খেলতে চাননি সভিলার। তাঁর ইচ্ছা ছিল ফিরে যাওয়া বেলজিয়ামে।

কিন্তু এখানেই ফিফার নিয়ম তাঁর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।

‘ওয়ান-ওয়ে রুল’ হিসেবে পরিচিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় ফেডারেশন বদলে নতুন দেশের হয়ে সিনিয়র পর্যায়ে একটি ম্যাচ খেললে আগের দেশের হয়ে আর খেলতে পারেন না। সেটি প্রীতি ম্যাচ হোক কিংবা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ—নিয়মের দৃষ্টিতে বিষয়টি একই।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের বিপক্ষে সার্বিয়ার হয়ে মাঠে নামার মাধ্যমে সভিলারও সেই নিয়মের মধ্যে পড়ে যান।

ফলে বেলজিয়ামের দরজা তাঁর জন্য আর খোলা নেই।

কোচ ডাকতে পারেন। সুযোগের কথা বলতে পারেন। কিন্তু তিনি যে দেশে ফিরতে চান, সেই দেশের জার্সি পরার অনুমতি নেই।

এটাই হয়তো ‘ওয়ান-ওয়ে টিকিট’-এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক।

টিকিট বদলানো যায় না। কিন্তু যে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছেছেন, সেখানে মনও বসে না।

সার্বিয়াও এখনো তাঁকে চায়

অন্যদিকে সার্বিয়ার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

২০২৫ সালে সার্বিয়ার কোচ ভেলিয়াকো পাউনোভিচ জানিয়েছিলেন, তিনি সভিলারের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং জাতীয় দলে তাঁর জায়গা এখনো আছে।

পাউনোভিচ বলেছিলেন, সভিলার নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তিনি আর জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না। কোচের দাবি ছিল, তিনি চেষ্টা করেছেন গোলকিপারটিকে বোঝাতে যে জাতীয় দলের কাছে তিনি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ চাইলে সার্বিয়ায় তাঁর ফেরার সম্ভাবনা ছিল।

কিন্তু সভিলারের মন পড়ে আছে বেলজিয়ামে।

আর সেখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় হতাশা।

একটি বুধবারের সিদ্ধান্ত

গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে সর্বশেষ হতাশার পরও বেলজিয়ামে ফেরার আশা ছাড়েননি সভিলার।

কিন্তু পাঁচ বছর আগে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত তাঁকে আজ এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সামনে থাকা দুই দরজার একটিতে প্রবেশের অনুমতি নেই, আর অন্যটিতে প্রবেশ করার ইচ্ছা নেই।

বিদেশে কাজের ভিসা পাওয়া মানুষজন জানেন, ওয়ান-ওয়ে টিকিটের ওজন কতটা। ফেরার তারিখের ঘরটি ফাঁকা থাকে। প্রথমে সেই ফাঁকা ঘর স্বাধীনতার মতো লাগে। পরে একদিন বোঝা যায়—ফিরতে চাইলেও আর টিকিট কাটা যাচ্ছে না।

মিলি সভিলারের গল্পটাও অনেকটা তেমন।

২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর। দেব্রেচেনে কাতারের বিপক্ষে সার্বিয়ার প্রস্তুতি ম্যাচ। বিরতির পর মাঠে নামলেন ২২ বছরের এক তরুণ গোলকিপার। সার্বিয়া জিতল ৪-০ গোলে।

সেদিন কেউ ভাবেনি, সেই ৪৫ মিনিটই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু এবং শেষ—দুটোই হয়ে থাকবে।

সভিলার হয়তো ভেবেছিলেন, এটা তো মাত্র একটি ম্যাচ।

জানতেন না, একদিন সেই ম্যাচের অর্ধেকটাই হয়ে উঠবে তাঁর পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three