Image

ইমরানকে লিডার বললে ‘এল’টা বড় হাতে লিখুন

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 2 ঘন্টা আগেআপডেট: 47 মিনিট আগে
ইমরানকে লিডার বললে ‘এল’টা বড় হাতে লিখুন

ইমরানকে লিডার বললে ‘এল’টা বড় হাতে লিখুন

ইমরানকে লিডার বললে ‘এল’টা বড় হাতে লিখুন

১৯৯২ বিশ্বকাপের কথা বলি। সত্যি বলতে, ইমরান খান ছাড়া আমরা আর কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখিনি। এখনো চোখে ভাসে, পার্থে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ইমরান ড্রেসিংরুমে ঢুকছেন। আমরা সবাই তখন ভীষণ হতাশ। অথচ মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে যেন জাদুর মতো সবাইকে বদলে দিলেন তিনি। সবার মনে বিশ্বাস জন্মাল—আজ আমরাই জিতব।

ওই বিশ্বকাপে আমি নতুন বলে বোলিং শুরু করে টানা ১০ ওভার করে যেতাম। আমাদের মূল বোলিং আক্রমণে ছিলাম আমি, ওয়াসিম আকরাম ও মুশতাক। প্রকৃত পেসার বলতে ছিলাম দুজন। ইমরানের কাঁধে এমন চোট ছিল যে, কীভাবে তিনি বোলিং করেছেন, তা ভেবেই এখনো অবাক হই। তখন ইমরান ছিলেন রান আটকে রাখার বোলার। কিন্তু আমাদের কাছে তাঁর একটাই চাওয়া ছিল—উইকেট।

শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমরা এই বিশ্বকাপ জিততে পারি।’ আমরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, লোকটা কি পাগল! কিন্তু এরপর যে বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন, সেটি এখনো আমার কানে বাজে।

ইমরান বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ানদের চাপে ফেলার একটাই উপায়—আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়া। রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেললে অস্ট্রেলিয়া আমাদের গুঁড়িয়ে দেবে। মাঠে নেমে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। দুই স্লিপ, এক গালি থাকবে। বাউন্সার, আউট সুইং—যার যা অস্ত্র আছে, সব ব্যবহার করতে হবে। তাঁর নিজের চাওয়া ছিল শুধু উইকেট; রান আটকানোর কথা ভাবতে হবে না।

এরপর তিনি আমাদের বোঝাতে থাকলেন, এই ম্যাচ জিতলেই পরের ম্যাচ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে—সেটিও আমরা জিতব। এরপর নিউজিল্যান্ড, যাদের আমরা আগেও হারিয়েছি। তারপর সেমিফাইনাল, ফাইনাল। বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব—এটাই তিনি আমাদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন।

সেই বক্তৃতার পর আমরা টগবগ করতে করতে মাঠে নেমেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে এর আগে বা পরে আর কখনো নিজেকে এতটা উদ্দীপ্ত মনে হয়নি। মাঠে নামার সময় মনে হচ্ছিল, ব্যাটসম্যান যেই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না—আজ আমাকে কেউ খেলতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার যাত্রার শুরু

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের প্রায় ছয় মাস পর কেউ একজন এসে বলল, ইমরান আমাকে খুঁজছেন। ভারতে একটি চ্যারিটি ম্যাচ খেলতে আমাকে নিতে চান তিনি।

ভারতে গিয়ে প্রথম ম্যাচের সকালে মাঠে ইমরান আমাকে বললেন, ‘তুমি তো নতুন বলে বোলিং করো, তাই না?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’

আমার হাতে বল দিয়ে ইমরান নিজেই ফিল্ডিং সাজাতে শুরু করলেন। একটি স্লিপ, একটি গালি, স্কয়ার লেগ—ওয়ানডেতে সাধারণত যেমন ফিল্ডিং সাজানো হয়। এরপর জানতে চাইলেন, ফিল্ডিং সেটিং ঠিক আছে কি না।

আমি বললাম, ‘না। স্কয়ার লেগের ফিল্ডারটাকে আমি দ্বিতীয় স্লিপে চাই। কারণ আমার বল বাইরে বেরিয়ে যায়।’

স্ট্রাইকিং এন্ডে তখন সুনীল গাভাস্কার!

সেই বয়সে গাভাস্কার-টাভাস্কার কাউকেই খুব একটা ভয় লাগত না। ইমরান একটু চমকে গিয়ে হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে।’

আমি ওই ম্যাচে দুই উইকেট নিয়েছিলাম। দুটিই স্লিপে ক্যাচ।

ওই সফরের পর জাতীয় দলের জন্য নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পরও নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন ইমরান। তিনি আমাকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমার যাত্রা শুরু।

প্রথম দেখাতেই যে বিশ্বাস

ইমরানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের দিনটিও স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৮৮ সালের শুরুর দিকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অনুশীলনে নেটে বোলিং করছিলাম। সেটিই ছিল প্রথম অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ক্যাম্প।

মুদাসসর নজর ও ইমরান আমার বোলিং দেখছিলেন। তাঁরা আমার নাম, কোথায় থাকি—এসব জানতে চাইলেন। একপর্যায়ে ইমরান আমাকে বললেন, ‘ওরা যদি তোমাকে দলে না নেয়, তুমি এসে জাতীয় দলের নেটে বোলিং করবে।’

আমি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছিলাম। এরপর মাঝেমধ্যে ইমরানের কথাটা মনে পড়ত। ভাবতাম, হঠাৎ কী মনে হয়েছিল যে কথাটা বলেছিলেন? ইমরান কি আমাকে আদৌ মনে রেখেছেন?

শুধু অনুপ্রেরণা নয়, প্রত্যেকের জন্য ছিল আলাদা পরিকল্পনা

ইমরান শুধু ‘নামো, জওয়ান, উড়িয়ে দাও’ বলে দায়িত্ব শেষ করতেন না। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট করে বলে দিতেন, কী করতে হবে।

আমাকে যেমন বলতেন, ‘তোমাকে দুটি স্লিপ দিচ্ছি, একটা গালি। এবার তোমার আউট সুইং দেখাও। মাঝেমধ্যে একটা বাউন্সারও দিও।’

ওয়াসিম আকরামকে আমার সামনেই ডেকে বলেছিলেন, ‘নো-বল বা ওয়াইড নিয়ে ভাবার দরকার নেই। তোমার কাজ জোরে বল করা। ওদের কাঁপিয়ে দাও।’

ওয়াকার ইউনিস বিশ্বকাপের আগে চোটে ছিটকে গিয়েছিলেন। তার আগে যখন আমরা তিনজন একসঙ্গে খেলেছি, ওয়াকারের প্রতি ইমরানের নির্দেশ ছিল একটাই—সোজা স্টাম্পে বল করো।

অধিনায়ক ইমরান খান কোথায় অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন?

এই প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো উত্তর দিতে পারেন তাঁর সতীর্থরাই। তাঁদেরই একজন আকিব জাভেদ, যিনি ইমরানের নেতৃত্বে ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলের সদস্য ছিলেন।

২০১৫ বিশ্বকাপের সময় মেলবোর্নের ল্যাংহাম হোটেলের ব্রেকফাস্ট টেবিলে আকিব জাভেদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন উৎপল শুভ্র। তখন আকিব ছিলেন বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত দলের কোচ। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলের পেসার।

ইমরান খানকে নিয়ে সেই সাক্ষাৎকারে আকিব যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা তাঁর নিজের ভাষাতেই সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরা যায়।

আকিবের চোখে ইমরান

‘আমার সঙ্গে কথা হলেই সবাই ১৯৯২ বিশ্বকাপের কথা তোলে। সেটির কথা মনে হলেই আমার চোখের সামনে একটি মুখই ভেসে ওঠে—ইমরান খান।

ওই মানুষটির কারণেই আমরা বিশ্বকাপ জিতেছিলাম।

ইমরানের কথা উঠলেই সবাই বলে, তিনি দারুণ এক নেতা, দুর্দান্ত অনুপ্রেরণাদায়ী—ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি আরও সহজভাবে ব্যাখ্যা করি।

ইমরান খানের তিনটি জিনিস ছিল—এক, তিনি সৎ; দুই, সাহসী; তিন, কঠোর পরিশ্রমী।

এই তিনটি গুণই ইমরান খানকে তৈরি করেছে। বড় নেতা হতে গেলে এই তিনটি জিনিস আপনার থাকতেই হবে।

আপনার সততা থাকলে মানুষ আপনাকে সম্মান করবে, আপনার কথা শুনবে। সাহসী হলে আপনি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর পরিশ্রম—এখনো দেখছেন না, ইমরান কী অক্লান্ত পরিশ্রমই না করে যাচ্ছেন!’

আকিব জাভেদের চোখে ইমরান খান তাই শুধু একজন অধিনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি সততা, সাহস ও পরিশ্রম দিয়ে সতীর্থদের বিশ্বাস করাতে পারতেন—অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three