শেন ওয়ার্নকে ২ লাখ ডলারের প্রস্তাব, সেলিম মালিকের সেই ফিক্সিং কাহিনি

শেন ওয়ার্নকে ২ লাখ ডলারের প্রস্তাব, সেলিম মালিকের সেই ফিক্সিং কাহিনি
শেন ওয়ার্নকে ২ লাখ ডলারের প্রস্তাব, সেলিম মালিকের সেই ফিক্সিং কাহিনি
১৯৯৪ সালের করাচি টেস্ট। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের দারুণ সুযোগ তৈরি করেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিনের আগের রাতে এমন এক ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ হয়ে ওঠে।
অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্নের দাবি, পাকিস্তানের তৎকালীন অধিনায়ক সেলিম মালিক তাঁকে ও সতীর্থ স্পিনার টিম মেকে দুই লাখ মার্কিন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শর্ত ছিল, পরদিন তাঁরা যেন ইচ্ছা করে বাজে বল করেন, যাতে পাকিস্তান ম্যাচটি হেরে না যায়। ওয়ার্ন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরে দলের অধিনায়ক মার্ক টেলর ও কোচ বব সিম্পসনকে পুরো ঘটনা জানান।
নিজের আত্মজীবনী *No Spin*-এ ঘটনাটি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন ওয়ার্ন। তাঁর বর্ণনায়, সেই রাতের অভিজ্ঞতা শুধু তাঁকে বিস্মিতই করেনি, ক্রিকেটের প্রতি তাঁর বিশ্বাসকেও বড় এক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছিল।
## যেভাবে রুমে ডেকে পাঠান সেলিম মালিক
১৯৯৪ সালে পাকিস্তান সফরে করাচিতে সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলছিল অস্ট্রেলিয়া। অধিনায়ক হিসেবে সেটি ছিল মার্ক টেলরের প্রথম টেস্ট। ম্যাচের চতুর্থ দিন শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ১৫৫ রান। জয়ের জন্য শেষ দিনে তাদের দরকার ছিল ৩১৪ রান।
ওয়ার্ন তখন একই কক্ষে থাকতেন টিম মের সঙ্গে। সন্ধ্যায় হঠাৎ হোটেলের ফোন বেজে ওঠে।
ফোনের ওপাশে ছিলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক সেলিম মালিক। তিনি ওয়ার্নকে নিজের কক্ষে যেতে বলেন। ওয়ার্ন প্রথমে ফোনেই কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মালিক জানান, বিষয়টি জরুরি এবং সামনাসামনি কথা বলা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ন তাঁর কক্ষে যান। মালিক তখন পাকিস্তানের প্রচলিত সাদা কুর্তা পরেছিলেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তিনি সরাসরি প্রস্তাবটি দেন।
ওয়ার্নের ভাষ্য অনুযায়ী, মালিক তাঁকে ও টিম মেকে দুই লাখ মার্কিন ডলার করে দেওয়ার কথা বলেন। আধা ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের হোটেলকক্ষে নগদ টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও জানান। বিনিময়ে পরদিন অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে বল করতে হবে, যাতে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা বল ছেড়ে দিতে পারেন এবং ম্যাচটি ড্র হয়ে যায়।
ওয়ার্ন প্রথমে ভেবেছিলেন, মালিক হয়তো মজা করছেন। কিন্তু তাঁর মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারেন, প্রস্তাবটি মোটেও ঠাট্টা নয়।
ওয়ার্ন সরাসরি জানিয়ে দেন, এমন প্রস্তাবে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। দুই লাখ ডলার অবশ্যই বড় অঙ্কের অর্থ, কিন্তু সেই অর্থের বিনিময়ে নিজের দলকে হারতে সাহায্য করবেন না তিনি। বরং অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি জেতার জন্যই মাঠে নামবে।
## টিম মেকে জানিয়ে ছুটলেন অধিনায়কের কাছে
মালিকের কক্ষ থেকে ফিরে ওয়ার্ন দ্রুত নিজের রুমে যান। সেখানে টিম মেকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। প্রথমে মে বিষয়টি শুনে হেসে ফেলেন। কিন্তু ওয়ার্ন যখন নিশ্চিত করেন যে মালিক সত্যিই দুই লাখ ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, তখন তিনিও বিস্মিত হয়ে যান।
দুজনের কাছে বিষয়টি ছিল অবিশ্বাস্য। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, এক মুহূর্ত দেরি না করে অধিনায়ক মার্ক টেলর ও কোচ বব সিম্পসনকে জানাতে হবে।
ওয়ার্নের বর্ণনা অনুযায়ী, টেলর ও সিম্পসন পুরো ঘটনা শুনে হতবাক হয়ে যান। অধিনায়ক হিসেবে টেলরের প্রথম টেস্ট, আর দল তখন জয়ের খুব ভালো অবস্থানে। এমন সময়ে দলের দুই প্রধান স্পিনার এসে জানালেন, প্রতিপক্ষের অধিনায়ক তাঁদের ইচ্ছা করে খারাপ বল করার জন্য বিপুল অর্থ দিতে চেয়েছেন।
মালিক অবশ্য ওয়ার্নকে ভাবার জন্য সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়ার্নের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সেরাটা দেওয়ার প্রত্যয় জানান।
## শেষ দিনে নাটকীয় লড়াই, এক উইকেটে পাকিস্তানের জয়
ম্যাচের শেষ দিনটি ছিল রোমাঞ্চে ভরা। পাকিস্তানের সামনে জয়ের লক্ষ্য বড় হলেও উইকেটে স্পিন ধরছিল। ওয়ার্নও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। চতুর্থ দিন বিকেলে একটি উইকেট নেওয়ার পর শেষ দিনে আরও চারটি উইকেট তুলে নেন তিনি।
একপর্যায়ে পাকিস্তানের হাতে ছিল সাত উইকেট, জয়ের জন্য দরকার ১৫৯ রান। পরে নবম উইকেটের পতনের সময়ও পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৫৬ রান। অস্ট্রেলিয়া তখন জয়ের খুব কাছাকাছি বলে মনে করছিল।
শেষ দিকে ইনজামাম-উল-হক ও মুশতাক আহমেদ পাকিস্তানের হয়ে লড়াই চালিয়ে যান। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জো অ্যাঞ্জেলও দারুণ বোলিং করছিলেন। এক পর্যায়ে অ্যাঞ্জেলের বলে ইনজামামকে এলবিডব্লিউ দেওয়ার জোরালো আবেদন ওঠে, কিন্তু আম্পায়ার সাড়া দেননি।
শেষ দিকে পাকিস্তানের প্রয়োজন নেমে আসে মাত্র তিন রানে। ওয়ার্নের বর্ণনা অনুযায়ী, মার্ক টেলর তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ইনজামামকে কীভাবে আউট করা যায়। ওয়ার্ন লেগ স্টাম্পে বল ফেলে টার্ন করানোর পরিকল্পনা করেন। বলটি ঠিক জায়গায় পড়লেও ইনজামাম সেটি মিস করেন এবং বল উইকেটকিপারের পাশ দিয়ে চলে যায়। চার বাই রান পায় পাকিস্তান।
শেষ পর্যন্ত এক উইকেট হাতে রেখেই ম্যাচটি জিতে নেয় স্বাগতিকেরা। অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি ছিল হতাশার হার। আর ওয়ার্নের কাছে ম্যাচটির স্মৃতি হয়ে থাকে আরও বেশি তিক্ত—কারণ, ম্যাচের আগের রাতেই তিনি ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছিলেন।
## পুরস্কার মঞ্চে সেলিম মালিকের বিদ্রূপ
ম্যাচ শেষে ওয়ার্নকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পুরস্কার নিতে মঞ্চে ওঠার সময় তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেলিম মালিক। ওয়ার্নের দাবি, মালিক তখন বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, প্রস্তাবের টাকা নিলে ভালো হতো কি না।
ওয়ার্ন জানান, কথাটি শুনে তাঁর ভেতরে প্রচণ্ড রাগ তৈরি হয়েছিল। নিজেকে সামলে নেন ঠিকই, কিন্তু সেই মুহূর্তের অনুভূতি তিনি কখনো ভুলতে পারেননি।
## কাইয়ুম কমিশনের তদন্ত ও আজীবন নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ
ওয়ার্ন ও টিম মের অভিযোগ পরে আনুষ্ঠানিক তদন্তের অংশ হয়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের গঠিত বিচারপতি কাইয়ুম কমিশন ১৯৯৪ সালের করাচি টেস্টে সেলিম মালিকের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলীয় বোলারদের ম্যাচ হারানোর উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধ করার অভিযোগ পর্যালোচনা করে।
কমিশন ওয়ার্নের সাক্ষ্যকে বিশ্বাসযোগ্য বলে উল্লেখ করে এবং সেলিম মালিককে টেস্ট ম্যাচ পাতানোর চেষ্টা ও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের দায়ে দোষী বলে মত দেয়। প্রতিবেদনে তাঁকে ক্রিকেটের সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়। সাবেক পাকিস্তানি বোলার আতাউর রেহমানের বিরুদ্ধেও আজীবন নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ ছিল।
মালিক অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এমন কোনো প্রস্তাব বা বৈঠকই ঘটেনি। তবে কমিশনের প্রতিবেদনে ওয়ার্নের বক্তব্যের পক্ষে টিম মের সাক্ষ্যকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শেন ওয়ার্ন ১৪৫ টেস্টে ৭০৮ উইকেট নিয়ে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। ২০২২ সালের ৪ মার্চ থাইল্যান্ডের কো সামুই দ্বীপে ছুটি কাটানোর সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
ক্রিকেট ইতিহাসে ওয়ার্নের পরিচয় এক কিংবদন্তি লেগ স্পিনার হিসেবে। তবে ১৯৯৪ সালের করাচি টেস্টের সেই রাত তাঁর স্মৃতিতে অন্য এক কারণে স্থায়ী হয়ে আছে—যে রাতে অর্থের বিনিময়ে ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার প্রস্তাব পেয়েও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।














