যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, কে এই আবদুল আল-সাইয়েদ?

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, কে এই আবদুল আল-সাইয়েদ?
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, কে এই আবদুল আল-সাইয়েদ?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির আবদুল আল-সাইয়েদ। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান থেকে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৭ বছরের সিনেট ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর হতে যাচ্ছেন তিনি।
১৭৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে কোনো মুসলিম আমেরিকান এই কক্ষের সদস্য হননি। অবসরে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে আল-সাইয়েদের জয় তাই দেশটির রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
তবে তাঁর নির্বাচনী প্রচার ছিল বেশ বিতর্কপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি—এসব বিষয়ে তাঁর অবস্থান নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
আবদুল আল-সাইয়েদের জন্ম মিশিগানের রচেস্টার হিলসে। তাঁর বাবা মিসরীয় অভিবাসী। শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে মিশিগানেই। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে ২০০৭ সালে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
এরপর রোডস স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ২০১১ সালে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে (এমডি) ডিগ্রি নেন।
তবে চিকিৎসক হিসেবে ব্যক্তিগত রোগী দেখার বদলে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করার পথ বেছে নেন আল-সাইয়েদ। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষকতাও করেছেন।
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন
২০১৫ সালে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন আল-সাইয়েদ। শহরটির আর্থিক সংকটের পর জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন।
পরে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণ সেবাবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ডেট্রয়েট শহরও এই কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত।
রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন ও সিনেটে ঐতিহাসিক জয়
২০২৬ সালে আবার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরেন আল-সাইয়েদ। ৪ আগস্ট মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি।
তাঁর প্রচারে সমর্থন জানান প্রগতিশীল ধারার পরিচিত কয়েকজন রাজনীতিক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং মিশিগানের কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব।
নির্বাচনী প্রচারে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচি চালু, আবাসন ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে ধনী ও করপোরেট দাতাদের প্রভাব হ্রাস এবং শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অন্যদিকে, তাঁর মুসলিম পরিচয় ও ইসরায়েলবিষয়ক অবস্থানও নির্বাচনী প্রচারের আলোচিত ইস্যু হয়ে ওঠে। আল-সাইয়েদ গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। তাঁর এসব বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমালোচনা ছিল।

নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে অবসরে যাওয়া গ্যারি পিটার্সের আসনটি ধরে রাখেন আল-সাইয়েদ। তাঁর এই জয় শুধু মিশিগানের রাজনীতিতেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করল।














