মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস

মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস
মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার হয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন হাকিম জেফ্রিস
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়ার পথে রয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা হাকিম জেফ্রিস। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন নিউইয়র্কের এই কংগ্রেস সদস্য। নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হবেন তিনি।
২০১৩ সালে প্রতিনিধি পরিষদে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ধাপে ধাপে দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছেন জেফ্রিস। ২০২৩ সালে ন্যান্সি পেলোসির পর প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হন তিনি। এবার স্পিকার হলে প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকারের ক্রমে ভাইস প্রেসিডেন্টের পরেই থাকবে তাঁর অবস্থান। একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও পড়বে তাঁর ওপর।
তবে স্পিকার হওয়ার পথ একেবারে মসৃণ নয়। দলের মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল অংশের মধ্যে মতপার্থক্য সামলানোর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত মোকাবিলা করতে হবে তাঁকে।
স্পিকার হওয়ার পথে দীর্ঘ প্রস্তুতি
কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জেফ্রিসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের মধ্যে আলোচনা ছিল। সাবেক কংগ্রেস সদস্য এডি বার্নিস জনসনসহ কয়েকজন নেতা তাঁকে ভবিষ্যতে স্পিকার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, ন্যান্সি পেলোসি অবসরে গেলে তাঁর জায়গায় নেতৃত্ব দেবেন জেফ্রিস।
এর আগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ এলেও তিনি সেগুলো গ্রহণ করেননি। কৃষ্ণাঙ্গ আইনপ্রণেতাদের সংগঠন কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাসের সভাপতি হওয়া, দলের হুইপের দায়িত্ব নেওয়া কিংবা নিউইয়র্ক নগরের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছেন। এমনকি ২০২৪ সালে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরামর্শও দিয়েছিলেন কেউ কেউ।
তবে জেফ্রিসের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হওয়া। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দলের ভেতরে আদর্শগত টানাপোড়েন
স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার আগে জেফ্রিসকে দলের দুই অংশের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের অনেকে মনে করেন, দলের বর্তমান নেতৃত্ব সময়ের দাবি অনুযায়ী যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে পারেনি। স্বাস্থ্যসেবা, ইসরায়েল-নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিষয়ে জেফ্রিসের অবস্থান নিয়ে তাঁদের একাংশের আপত্তি রয়েছে।
জেফ্রিস আগে করপোরেট আইনজীবী ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনকে সহকর্মীদের কেউ কেউ সতর্ক ও হিসাবি বলে বর্ণনা করেন। আবার ঘনিষ্ঠদের মতে, প্রয়োজন হলে তিনি দৃঢ়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। ট্রাম্প প্রশাসন ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি পিছপা হবেন না।
দলের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, জেফ্রিস সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাকে ডেমোক্র্যাটদের কর্মসূচির কেন্দ্রে আনতে চান। ধনীদের ওপর কর বাড়ানো, বড় কোম্পানির নির্বাহীদের কংগ্রেসে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং শ্রমজীবী পরিবারের আয় ও সুযোগ বাড়ানোর বিষয়গুলো তাঁর অগ্রাধিকারে থাকবে।
এ ছাড়া ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সুপ্রিম কোর্টের জন্য নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও তিনি আগ্রহী। তবে দলের প্রগতিশীল অংশের সব দাবি বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষে সহজ হবে না। অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিই বিলুপ্ত করা কিংবা সবার জন্য মেডিকেয়ার চালুর মতো প্রস্তাবে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই অগ্রাধিকার
সাম্প্রতিক সময়ে জেফ্রিস বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে এবং প্রচলিত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন চায়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, স্পিকার হলে সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেবেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানো, আবাসনকে আরও সাশ্রয়ী করা, শিশুদের জন্য কর সুবিধা বাড়ানো এবং শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়ে কংগ্রেসে উদ্যোগ নিতে পারেন তিনি।
কলোরাডোর কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো মনে করেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতা বাড়ালে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে সবার জন্য মেডিকেয়ার চালুর পদ্ধতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে একমত হওয়া এখনো কঠিন।
কংগ্রেস সদস্যদের শেয়ার কেনাবেচা নিষিদ্ধ করার দাবিও ভোটারদের আলোচনায় রয়েছে। এ বিষয়ে নতুন আইন করার উদ্যোগ থাকলেও দলের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে মতপার্থক্য সামলাতে হবে জেফ্রিসকে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কঠিন সম্পর্ক
স্পিকার হলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে জেফ্রিসের অন্যতম বড় দায়িত্ব। বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক, সরকারি ব্যয় এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা।
তবে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সমঝোতা করাও প্রয়োজন হবে। সরকারি ব্যয় অনুমোদন, ঋণসীমা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য শাটডাউন এড়ানোর মতো বিষয়ে রিপাবলিকানদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে তাঁকে। ট্রাম্প নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো’ বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের কোনো বিল পাস হলেও প্রেসিডেন্টের সম্মতি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে জেফ্রিসের ব্যক্তিগত বৈঠক নিয়েও দলের প্রগতিশীল অংশে সমালোচনা হয়েছিল। তবে জেফ্রিসের যুক্তি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সমস্যা সমাধানের জন্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হয়।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরব কণ্ঠ
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান জেফ্রিস। ২০২০ সালে সিনেটে ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসন বিচারে প্রতিনিধি পরিষদের পক্ষ থেকে অভিযোগ উপস্থাপনকারী আইনপ্রণেতাদের একজন ছিলেন তিনি। তৎকালীন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাঁকে এই দায়িত্বের জন্য বেছে নিয়েছিলেন।
সেই সময় সিনেটের অধিবেশনকক্ষে প্রয়াত র্যাপার দ্য নটোরিয়াস বি আই জির গান উদ্ধৃত করে বক্তব্য দেওয়ায় আলোচনায় আসেন জেফ্রিস। সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। কিশোর বয়সে ব্রুকলিনে ‘কিড ফ্রেশ’ নামে র্যাপের লড়াইয়েও অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বাক্যুদ্ধও বহুবার আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাবে জেফ্রিসও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। দলের সহকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক লড়াইয়ে সরাসরি অবস্থান নিতে তিনি দ্বিধা করেন না।
তবে তাঁর নেতৃত্বের সময় দলের ভেতরেও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। চার্লি কার্ক হত্যার পর তাঁর স্মরণে রিপাবলিকানদের আনা একটি প্রস্তাবে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাসের কয়েকজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, প্রস্তাবে কার্কের প্রশংসা করা হলেও কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে।
এ ধরনের মতবিরোধ সামলে দলের ঐক্য ধরে রাখাও স্পিকার হিসেবে জেফ্রিসের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
সীমান্তনীতি ও দলের ভাবমূর্তি
ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সীমান্তনীতি নিয়েও কাজ করেছেন জেফ্রিস। ২০২২ সালে টেক্সাসের কংগ্রেস সদস্য হেনরি কুয়েলারের পরামর্শে লারেডো শহরে গিয়ে সীমান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। স্থানীয় সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন।
সেই সফরের পর সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি অভিবাসীদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে বলতে শুরু করেন জেফ্রিস। দলের ভেতরে তাঁর এই অবস্থানকে বাস্তববাদী রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখা হয়।
এবার স্পিকার হলে তাঁর সামনে থাকবে আরও বড় দায়িত্ব—একদিকে ভোটারদের পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ, অন্যদিকে দলের মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল অংশকে একই অবস্থানে রাখা। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি কংগ্রেসের ভেতরে সমঝোতার পথও খুঁজতে হবে তাঁকে।
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া জেফ্রিসের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে ইতিহাস গড়তে হলে জানুয়ারির স্পিকার নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামী দুই বছর নেতৃত্বের কঠিন পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে হবে তাঁকে।














