Image

মেসির ছায়াসঙ্গী হোর্হে আর নেই, পেছনে ফেলে গেলেন এক অনন্য ফুটবল-গল্প

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 3 ঘন্টা আগেআপডেট: 1 ঘন্টা আগে
মেসির ছায়াসঙ্গী হোর্হে আর নেই, পেছনে ফেলে গেলেন এক অনন্য ফুটবল-গল্প

মেসির ছায়াসঙ্গী হোর্হে আর নেই, পেছনে ফেলে গেলেন এক অনন্য ফুটবল-গল্প

মেসির ছায়াসঙ্গী হোর্হে আর নেই, পেছনে ফেলে গেলেন এক অনন্য ফুটবল-গল্প

রোজারিওর মালভিনাস মাঠ। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। মাঠের এক কোণে ছুটে বেড়াচ্ছে ছোট্ট এক ছেলে, পেছনে দাঁড়িয়ে নীরবে তাকে দেখছেন এক বাবা। ছেলেটি বলের পেছনে ছুটছে, আর বাবা হয়ে উঠেছেন তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছায়া। দৃশ্যটা বদলায়নি বছরের পর বছর। শুধু সময় বদলেছে, মাঠ বদলেছে। বদলায়নি বাবার জায়গাটা।

সেই ছায়াটাই এবার চিরতরে সরে গেল।

রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের নেপথ্যে থাকা এক মানুষের দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

হোর্হে মেসি নিজেও একসময় ফুটবল খেলতেন। নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুব দলে খেলেছেন তিনি। কিন্তু সামরিক চাকরির বাধ্যবাধকতায় থেমে যায় তাঁর সেই স্বপ্ন। পরে রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে আশির দশকে আকিন্দার একটি ইস্পাত কারখানায় যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে ধীরে ধীরে ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ওঠেন।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল অন্য কিছু—ছোট্ট লিওনেলকে ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলা।

ছেলের প্রতিভা হোর্হে খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন। কিন্তু ১০ বছর বয়সে এসে দেখা দিল বড় সমস্যা। মেসির উচ্চতা প্রত্যাশামতো বাড়ছিল না। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর জানা গেল, তাঁর শরীরে স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি হচ্ছে না।

চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলারের বিশেষ ইনজেকশন। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য যা ছিল বিশাল ব্যয়। শুরুতে নিজের সঞ্চয় ও কর্মস্থল থেকে পাওয়া সহায়তায় চিকিৎসার খরচ চালিয়ে যান হোর্হে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের কাছেও সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১২ বছরের একটি শিশুর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় এত বড় বিনিয়োগ করার সামর্থ্য ছিল না ক্লাবটির।

এরপর আসে সেই মুহূর্ত, যা বদলে দেয় মেসি পরিবারের ভবিষ্যৎ।

২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছোট্ট মেসির ফুটবল দক্ষতার একটি ভিডিও তৈরি করা হয়। কমলা, টেনিস বল ও টেবিল টেনিসের বল দিয়ে তাঁর অসাধারণ কৌশলের নানা দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। সেই ভিডিও পৌঁছে যায় স্পেনে ব্যবসা করা রোসারিওর বাসিন্দা হোরাশিও গাহগিওলির হাতে। তাঁর মাধ্যমেই ভিডিওটি যায় বার্সেলোনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে।

এরপর শুরু হয় মেসির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা।

২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে জীবনে প্রথম বিমানে চড়েন লিওনেল মেসি। সঙ্গে ছিলেন বাবা হোর্হে। গন্তব্য স্পেন। বার্সেলোনায় গিয়ে প্রথম অনুশীলনেই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখান কিশোর মেসি।

কিন্তু মাঠের বাইরে তখনও অনিশ্চয়তা। চুক্তি নিয়ে নানা জটিলতায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছিল বার্সেলোনা। ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার কথাও ভাবছিলেন হোর্হে। শেষ পর্যন্ত ক্লাবের তৎকালীন কর্মকর্তাদের একজন টেনিস খেলার ফাঁকে একটি পেপার ন্যাপকিনে লিখে দেন মেসিকে বার্সেলোনায় নেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

সেই ছোট্ট ন্যাপকিনের লেখা পরবর্তী দুই দশকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান সিদ্ধান্তগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

তবে বার্সেলোনায় মেসির শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। ভাষা অপরিচিত, বন্ধুবান্ধব নেই, পরিবারের অন্য সদস্যরা তখনও আর্জেন্টিনায়। এক সাক্ষাৎকারে মেসি জানিয়েছিলেন, বাবা-ছেলে দুজনেই একাকিত্বে কাঁদতেন। কিন্তু কেউ কাউকে সেটা বুঝতে দিতেন না।

একসময় হোর্হে ছেলেকে প্রশ্ন করেছিলেন—স্পেনে থেকে যেতে চাও, নাকি দেশে ফিরে যেতে চাও?

মেসির উত্তর ছিল, তিনি থেকে যেতে চান।

আর সেই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা।

চৌদ্দ বছর বয়সে হোর্হে মেসি ছেলের এজেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর ক্যারিয়ারের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে ছিলেন তিনি। বার্সেলোনার একের পর এক চুক্তি, পিএসজিতে যাওয়া, ইন্টার মায়ামিতে নতুন অধ্যায়—মেসির মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তগুলোতে বাবার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল তারকায় পরিণত হওয়ার পরও হোর্হে নিজেকে প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন। হাতে গোনা কিছু সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যে ছেলের সাফল্য কিংবা পরিবারের নানা মুহূর্তের ছবি শেয়ার করেছেন। বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টগুলোতেও মেসি পরিবারের সঙ্গে গ্যালারিতে তাঁকে নিয়মিত দেখা গেছে।

কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্য আর দেখা যাবে না।

মেসির ক্যারিয়ারের শেষ দিকের কঠিন সময়গুলোতেও বাবার অসুস্থতা ছিল পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময়ও মেসির কথায় ব্যক্তিগত কঠিন সময়ের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। পরে জানা যায়, হোর্হে মেসি অসুস্থ ছিলেন এবং চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

ফুটবল ইতিহাস লিওনেল মেসিকে মনে রাখবে তাঁর অসাধারণ বাঁ পা, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, অগণিত গোল ও ট্রফির জন্য। কিন্তু সেই ইতিহাসের নেপথ্যে থাকা মানুষটির গল্পটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

কারণ মেসির প্রথম দর্শক ছিলেন তাঁর বাবা। তিনিই সন্তানের প্রতিভা চিনেছিলেন, চিকিৎসার খরচ জোগাড় করেছিলেন, বিদেশের অনিশ্চিত যাত্রায় ছেলের হাত ধরেছিলেন এবং কঠিন সময়ে পাশে থেকেছিলেন।

আজ হোর্হে মেসি নেই। রোজারিওর কোনো মাঠে আর হয়তো দেখা যাবে না সেই চেনা মানুষটিকে, যিনি দূর থেকে ছেলের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখতেন।

তবু লিওনেল মেসি যখনই মাঠে নামবেন, কোনো গোলের পর আকাশের দিকে তাকাবেন কিংবা কোনো ট্রফি হাতে তুলে ধরবেন—সেই মুহূর্তগুলোর ভেতরেই থেকে যাবেন হোর্হে মেসি।

ছেলের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নীরব ছায়া হয়ে।

 

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three