‘মে ডে’: আশির দশকের নস্টালজিয়ায় রায়ান রেনল্ডস-কোনেথ ব্রানার বাডি অ্যাকশন
- 1
ফিফার তহবিল অপব্যবহারে দুই সাবেক সভাপতি আজীবন নিষিদ্ধ
- 2
iPhone 18 Pro Max কবে বাজারে আসছে? সঙ্গে প্রথম ফোল্ডেবল iPhone Duo
- 3
ভিনিসিউসকে দুয়ো নিয়ে মরিনিয়ো: ‘ফলভরা গাছেই মানুষ ঢিল ছোড়ে’
- 4
ইউএস ওপেন ফাইনালে শেলটন–জভেরেভ, ৫৩ বছর পর ইতিহাসের সামনে আমেরিকান তারকা
- 5
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এআই’, আশঙ্কায় অ্যানথ্রপিকের গবেষকের পদত্যাগ

‘মে ডে’: আশির দশকের নস্টালজিয়ায় রায়ান রেনল্ডস-কোনেথ ব্রানার বাডি অ্যাকশন
‘মে ডে’: আশির দশকের নস্টালজিয়ায় রায়ান রেনল্ডস-কোনেথ ব্রানার বাডি অ্যাকশন
দিন কয়েক ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন হয়ে উঠেছে নস্টালজিয়া উসকে দেওয়ার এক বড় মাধ্যম। সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত তারকারাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আশির দশকের আদলে ছবি তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন। আর সেই ছবির সূত্র ধরেই নতুন করে আলোচনায় আসছে আশির দশকের পপ কালচারের নানা অনুষঙ্গ।
এমন এক সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম Apple TV+-এ এসেছে নতুন সিনেমা ‘Mayday’। ছবিটির গল্পও আশির দশকের প্রেক্ষাপটে। সময়ের এই কাকতালীয় মিল সিনেমাটিকে ঘিরে আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকেও বেশ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে জন ফ্রান্সিস ড্যালি ও জোনাথন গোল্ডস্টেইন পরিচালিত এই বাডি অ্যাকশন-কমেডি।
আশির দশকের সিনেমার নস্টালজিয়া
আশির দশকের সিনেমার কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধবিমান, বরফঢাকা সীমান্ত, শত্রুর পেছনে ছুটে চলা নায়ক, গাড়ি ধাওয়া, অসম্ভব সব অ্যাকশন এবং দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব।
‘Mayday’ যেন সেই পুরোনো দিনের সিনেমারই আধুনিক সংস্করণ। ছবিটি ‘Top Gun’-এর বিমানযুদ্ধ, আশির দশকের বাডি কমেডির হাস্যরস এবং শীতল যুদ্ধের আবহকে একসঙ্গে মিশিয়েছে।
গল্প খুব মৌলিক নয়, কিন্তু নির্মাণের গতি ও অভিনয়ের কারণে সিনেমাটি বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
কী নিয়ে ‘Mayday’-এর গল্প?
গল্পের শুরু ১৯৮৭ সালে। মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলট ট্রয় ‘অ্যাসাসিন’ কেলি চরিত্রে অভিনয় করেছেন রায়ান রেনল্ডস। একটি গোপন মিশনে সোভিয়েত রাশিয়ার আকাশসীমায় প্রবেশের পর তাঁর যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।
বরফে ঢাকা দুর্গম এলাকায় আহত অবস্থায় পড়ে থাকার পর জ্ঞান ফেরে কেলির। তখন তিনি আবিষ্কার করেন, তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন স্থানীয় এক রুশ নাগরিক—নিকোলাই উস্তিনভ। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন কেনেথ ব্রানা।
কিন্তু নিকোলাই মোটেও সাধারণ কোনো নাগরিক নন। তিনি একজন সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের গোপন মিশনে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে আটকা পড়া মার্কিন পাইলটের আশ্রয়দাতা যখন খোদ সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা, তখন থেকেই গল্পে তৈরি হয় অন্যরকম এক টানাপোড়েন।
আমেরিকাপ্রেমী সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা
নিকোলাই সোভিয়েত ব্যবস্থায় বীতশ্রদ্ধ। বরং তিনি মার্কিন পপ কালচারের ভক্ত। তাঁর ঘরে ‘Top Gun’-এর পোস্টার, আমেরিকান গান ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল আকর্ষণ—সব মিলিয়ে চরিত্রটি শুরু থেকেই আলাদা।
প্রথমে কেলিকে নিজের কেবিনে লুকিয়ে রাখতে চান নিকোলাই। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কেলিকে ধরতে কেজিবি কর্মকর্তা আলেকজান্ডার ভলকভ ও তাঁর বাহিনী তাড়া শুরু করলে নিকোলাইও নিজের দেশের চোখে শত্রুতে পরিণত হন।
এরপর শুরু হয় দুজনের বিপজ্জনক যাত্রা। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তাঁদের পৌঁছাতে হবে মস্কোর মার্কিন দূতাবাসে।
কেলির প্রয়োজন দেশে ফেরার নিরাপদ পথ। অন্যদিকে নিকোলাই চান যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়। ফলে একে অপরকে খুব একটা পছন্দ না করলেও পরিস্থিতির কারণে তাঁদের একসঙ্গে পথ চলতে হয়।
একজন মার্কিন সামরিক পাইলট, অন্যজন সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা—শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই দুই বিপরীত মেরুর মানুষ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন অসম্ভব এক জুটি।
রাজনীতি নয়, মানুষের গল্প
‘Mayday’ কোল্ড ওয়ারের রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে গভীর কোনো বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেনি। বরং শত্রুতা, জাতীয় পরিচয় ও মতাদর্শের বাইরে মানুষের সম্পর্ককে সামনে এনেছে।
কে আমেরিকান, কে রুশ—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিপদের সময় কে কার পাশে দাঁড়াচ্ছে।
অবশ্য এই সরলীকরণই ছবিটির অন্যতম সীমাবদ্ধতা। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দুই পরাশক্তির দীর্ঘ দ্বন্দ্বকে শেষ পর্যন্ত অনেকটা ‘আমরা আসলে একে অন্যের মতোই’ ধরনের সহজ বার্তায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
তবে ‘Mayday’ কোনো রাজনৈতিক থ্রিলার নয়। এটি মূলত একটি অ্যাকশন-কমেডি। সেই জায়গা থেকে দেখলে নির্মাতারা বেশ সফল।
দ্রুতগতির অ্যাকশন ও কমেডি
প্রায় ১১০ মিনিটের সিনেমাটির অন্যতম শক্তি এর গতি। এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাওয়ার সময় একঘেয়েমি তৈরি হওয়ার সুযোগ খুব কম।
বরফঢাকা বন, গাড়ি ধাওয়া, ট্রেন, উড়োজাহাজ এবং নানা ধরনের অ্যাকশন—সব মিলিয়ে গল্প দ্রুত এগিয়ে চলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমেডি।
কখনো লুকিয়ে থাকার দৃশ্য, কখনো ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত হওয়া—এ ধরনের ছোট ছোট মজার মুহূর্ত সিনেমাটিকে প্রাণবন্ত রেখেছে।

‘Top Gun’-এর প্রতি ভালোবাসা
‘Mayday’ নিজের পূর্বসূরিদের কথাও ভুলে যায়নি। ‘Top Gun’-এর প্রতি সিনেমাটির ভালোবাসা স্পষ্ট।
ব্রুস স্প্রিংস্টিনের গান, পোশাক, চরিত্রের ধরন, ক্যামেরার ব্যবহার—সবকিছুতেই আশির দশকের প্রতি একধরনের নস্টালজিয়া রয়েছে। এমনকি অ্যাকশন দৃশ্যেও সেই সময়ের বড় পর্দার রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে কখনো কখনো আশির দশকের প্রতি এই অতিরিক্ত সচেতনতা সিনেমাটিকে স্বাভাবিক গল্পের বদলে ‘নস্টালজিয়ার প্রদর্শনী’ বলেও মনে করায়।
রায়ান রেনল্ডস নাকি ‘রায়ান রেনল্ডস’?
ট্রয় কেলি চরিত্রে রায়ান রেনল্ডস দর্শকদের পরিচিত সেই রসিক, আত্মবিশ্বাসী ও ব্যঙ্গাত্মক রূপটিই ধরে রেখেছেন।
তাঁর সংলাপ, হাস্যরস এবং আচরণ অনেকটাই পরিচিত রেনল্ডস-ধাঁচের। ফলে চরিত্রটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের চেয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, ‘রায়ান রেনল্ডস চরিত্রে রায়ান রেনল্ডস’ অভিনয় করছেন।
তবে সেটিই ছবির দুর্বলতা হয়ে ওঠেনি, কারণ তাঁর চেনা ব্যক্তিত্বই সিনেমার কমেডি অংশকে এগিয়ে নিয়েছে।
কেনেথ ব্রানার বড় চমক
নিকোলাই উস্তিনভ চরিত্রে কেনেথ ব্রানা অবশ্য পুরোপুরি ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। তিনি চরিত্রটিকে শুধু ‘আমেরিকাপ্রেমী সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা’ হিসেবে দেখাননি।
নিকোলাইয়ের মধ্যে বিষণ্নতা, একাকিত্ব, বিদ্রোহ এবং শিশুসুলভ কৌতূহল—সবকিছুই ফুটিয়ে তুলেছেন ব্রানা। ফলে চরিত্রটি একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক এবং মানবিক হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় চমক তাঁর অ্যাকশন দৃশ্যে। শেকসপিয়ার, গোয়েন্দা কিংবা গম্ভীর চরিত্রে বেশি দেখা ব্রানাকে এখানে ঘুষি মারতে, লড়াই করতে এবং ধাওয়া করতে দেখা বেশ মজার অভিজ্ঞতা।
৬৫ বছর বয়সেও অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁর উপস্থিতি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। বরং সিনেমাটি দেখার পর মনে হতে পারে—এত দিন কেন তাঁকে এমন চরিত্রে আরও বেশি দেখা গেল না!
রেনল্ডস-ব্রানা রসায়নই ছবির প্রাণ
একজন আত্মবিশ্বাসী মার্কিন পাইলট, অন্যজন আমেরিকান সংস্কৃতিতে মুগ্ধ এক রুশ সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। দুজনের পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঝগড়া এবং ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পৌঁছানোর পথটাই ‘Mayday’-এর সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ।
ব্রানা তাঁর অভিনয় দিয়ে রেনল্ডসের চেনা হাস্যরসকে ভারসাম্য দিয়েছেন। ফলে সিনেমাটি রেনল্ডসকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মনে থাকার মতো চরিত্র হয়ে ওঠে নিকোলাই।
ভিলেনের চরিত্রেও রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা। মারচিন দোরচিনস্কি প্রচলিত ‘রুশ ভিলেন’-এর ছাঁচে না গিয়ে আলেকজান্ডার ভলকভকে তুলনামূলক সংযতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
কিছু চরিত্র আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যেত
তবে ‘Mayday’ একেবারে নিখুঁত নয়। সিনেমাটি যতটা প্রত্যাশা তৈরি করে শুরু হয়, শেষ পর্যন্ত সব চরিত্রকে ততটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেনি।
নিকোলাইয়ের মেয়ে আনার চরিত্রটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। একইভাবে হ্যারল্ড কেলি চরিত্রটিও গল্পে আরও আবেগ যোগ করার সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
তবু এসব সীমাবদ্ধতা সিনেমার মূল আনন্দকে খুব বেশি নষ্ট করে না।
‘Mayday’ ‘Top Gun: Maverick’ হওয়ার চেষ্টা করেনি। বরং ‘Top Gun’, ‘Midnight Run’ এবং আশির দশকের বাডি অ্যাকশন-কমেডির প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজের মতো একটি মিশ্রণ তৈরি করেছে।
গল্পে খুব বেশি নতুনত্ব নেই, রাজনৈতিক বিশ্লেষণও গভীর নয়। কিন্তু দ্রুতগতির অ্যাকশন, হালকা কমেডি, আশির দশকের নস্টালজিয়া এবং বিশেষ করে রায়ান রেনল্ডস ও কেনেথ ব্রানার রসায়ন সিনেমাটিকে বেশ উপভোগ্য করে তুলেছে।














