গ্রাম থেকে হলিউডের শীর্ষ তারকা, সিডনি সুইনির ২৯ বছরের গল্প
- 1
সাইমকে টেস্টে খেলানোই ‘অসম্মান’, পাকিস্তানকে নিয়ে নাসের হুসেইনের কড়া সমালোচনা
- 2
শৈশবে টেনিস তারকা হওয়ার স্বপ্নই ছিল না, সেই রিবাকিনাই এখন বিশ্বসেরা
- 3
আশ্রয়প্রার্থী ভেবে ইংল্যান্ডে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের ঘিরে ধরেছিলেন বিক্ষোভকারীরা
- 4
সিপিএলে নেমেই মিরাজের স্পিন–ফাঁস, তাহির বললেন, ‘বিশ্বমানের বোলার’
- 5
১০০ কোটির সাফল্যের পর মা হচ্ছেন সামান্থা, অসুস্থতা ও অভিনয়ে ফেরার গল্পও জানালেন

গ্রাম থেকে হলিউডের শীর্ষ তারকা, সিডনি সুইনির ২৯ বছরের গল্প
গ্রাম থেকে হলিউডের শীর্ষ তারকা, সিডনি সুইনির ২৯ বছরের গল্প
সিডনি সুইনি মানেই যেন আলোচনার আরেক নাম। কখনো পর্দার অন্তরঙ্গ দৃশ্য, কখনো বিজ্ঞাপন, আবার কখনো ব্যক্তিজীবন—বিভিন্ন কারণে নিয়মিতই খবরের শিরোনামে থাকেন এই মার্কিন অভিনেত্রী। তবে বিতর্কের পাশাপাশি তাঁর জনপ্রিয়তাও দিন দিন বেড়েছে। ‘ইউফোরিয়া’, ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’, ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ ও ‘দ্য হাউসমেইড’-এর মতো আলোচিত কাজ তাঁকে হলিউডের অন্যতম পরিচিত তরুণ তারকায় পরিণত করেছে।
আজ ১২ সেপ্টেম্বর সিডনি সুইনির জন্মদিন। ১৯৯৭ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেনে জন্মেছিলেন তিনি। ২৯ বছরে পা দেওয়া এই অভিনেত্রীর ক্যারিয়ার অবশ্য শুরু হয়েছিল একেবারেই ভিন্ন পরিবেশে।
গ্রামীণ পরিবেশ থেকে অভিনয়ের স্বপ্ন
স্পোকেনের কাছাকাছি ওয়াশিংটন-আইডাহো সীমান্তের গ্রামীণ এলাকায় কেটেছে সিডনির শৈশব। তাঁর মা ছিলেন ক্রিমিনাল ডিফেন্স আইনজীবী, বাবা কাজ করতেন হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে।
ছোটবেলায় খেলাধুলার প্রতিও তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। ফুটবল, সফটবল, স্কি ও ওয়েকবোর্ডিংয়ের পাশাপাশি তায়কোয়ান্দো, জুজিৎসু, গ্র্যাপলিং ও কিকবক্সিংও শিখেছেন তিনি। পড়াশোনাতেও ছিলেন মেধাবী। গণিত ও রোবোটিকসের মতো বিষয়েও আগ্রহ ছিল তাঁর।
তবে অভিনয়ের স্বপ্নটা ছিল আরও পুরোনো। ছোটবেলায় পরিবারের সামনে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতেন সিডনি। কিন্তু তাঁর মা-বাবার কাছে অভিনয় শুরুতে ছিল অনেকটা শিশুর ‘রাজকন্যা হওয়ার’ স্বপ্নের মতো—পেশা হিসেবে সেটিকে তাঁরা গুরুত্ব দেননি।
পরিস্থিতি বদলে যায় যখন তাঁদের এলাকায় একটি স্বল্প বাজেটের সিনেমার শুটিং শুরু হয়। তখন সিডনির বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। অডিশনে অংশ নেওয়ার অনুমতি পেতে মা-বাবার সামনে রীতিমতো পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করেন তিনি।
সেখানে পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা দেখিয়ে বোঝান—কীভাবে অডিশন দেবেন, বিজ্ঞাপন ও ছোট চরিত্রে কাজ করবেন, এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং ধীরে ধীরে হলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করবেন।
একটি শিশুর এমন পরিকল্পনা দেখে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যান তাঁর মা-বাবা। সেই সিনেমায় সুযোগও পান সিডনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে সংগ্রামের দিন
মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে আসেন সিডনি। কিন্তু স্বপ্নের শহরে পৌঁছেই সাফল্য আসেনি। বরং শুরু হয় দীর্ঘ সংগ্রাম।
একটার পর একটা অডিশন, প্রত্যাখ্যান আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। ‘প্রিটি লিটল লায়ার্স’, ‘গ্রেস অ্যানাটমি’, ‘ক্রিমিনাল মাইন্ডস’ ও ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এর মতো সিরিজে ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও বড় সুযোগ পেতে সময় লেগেছে।
সিডনি নিজেই বলেছেন, ছোটবেলায় তৈরি করা পাঁচ বছরের পরিকল্পনা বাস্তবে পূরণ হতে তাঁর প্রায় ১০ বছর লেগেছিল। কিশোরী বয়সে নিয়মিত প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা সহজ ছিল না। ছোট শহর থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে দেখেছেন, একই স্বপ্ন নিয়ে হাজারো তরুণ-তরুণী প্রতিদিন অডিশন দিচ্ছেন।
পরিবারের ওপরও তৈরি হয়েছিল আর্থিক চাপ। লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকা, অডিশন দেওয়া ও অভিনয়ের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁদের। একপর্যায়ে তাঁর মা-বাবার বিচ্ছেদ হয় এবং পরিবার দেউলিয়াত্বের আবেদনও করে।
এই কঠিন সময়ই অবশ্য সিডনিকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
‘ইউফোরিয়া’ বদলে দেয় ক্যারিয়ার
২০১৮ সালে ‘এভরিথিং সাক্স!’ ও ‘শার্প অবজেক্টস’-এ অভিনয় করে নজরে আসেন সিডনি। এরপর ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এ কাজ করে পরিচিতি বাড়ে। কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০১৯ সালে এইচবিওর ‘ইউফোরিয়া’ দিয়ে।
সিরিজটিতে ক্যাসি হাওয়ার্ড চরিত্রে অভিনয় করে দ্রুত দর্শকের নজরে চলে আসেন তিনি। আবেগপ্রবণ, ভঙ্গুর এবং প্রেম ও আত্মপরিচয়ের সংকটে থাকা এক তরুণীর জটিল চরিত্রটি সিডনি এমন দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন যে রাতারাতি প্রজন্মের অন্যতম আলোচিত অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন।
এরপর ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর অলিভিয়া মোসবাখার চরিত্র তাঁর পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়। দুটি সিরিজের জন্যই এমি মনোনয়ন পেয়েছেন সিডনি। ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর জন্য ২০২২ সালে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে এমি মনোনয়ন তাঁর অভিনয়প্রতিভার বড় স্বীকৃতি হয়ে আসে।
শুধু গ্ল্যামার নয়, অভিনয়েও প্রমাণ
সিডনিকে শুরুতে অনেকেই শুধু গ্ল্যামারাস ও আবেদনময় চরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে দেখতেন। কিন্তু ‘রিয়েলিটি’ সিনেমায় সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন তিনি।
সিনেমাটিতে রিয়েলিটি উইনারের চরিত্রে একেবারেই গ্ল্যামারহীন রূপে অভিনয় করেন সিডনি। তাঁর অভিনয় প্রশংসা কুড়ায় সমালোচকদেরও।
পেশাদার বক্সার ক্রিস্টি মার্টিনের জীবনের ওপর নির্মিত ‘ক্রিস্টি’ সিনেমার জন্যও নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেন তিনি। বক্সিং প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি চরিত্রটির জন্য নিজের শরীর ও চেহারায় বড় পরিবর্তন আনেন। এতে স্পষ্ট হয়, শুধু তারকা-ইমেজে আটকে থাকতে চান না সিডনি।
‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ এনে দেয় বড় সাফল্য
টেলিভিশনের পাশাপাশি সিনেমাতেও ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি। কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম...ইন হলিউড’-এ ছোট চরিত্র দিয়ে শুরু করে ‘দ্য ভয়েড’, ‘ইম্যাকুলেট’ ও ‘ম্যাডাম ওয়েব’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেছেন।
তবে ২০২৩ সালের রোমান্টিক কমেডি ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। গ্লেন পাওয়েলের সঙ্গে জুটি বেঁধে সিনেমাটির সাফল্য তাঁকে বক্স অফিসের পরিচিত তারকায় পরিণত করে।

নগ্ন দৃশ্য নিয়ে এত আলোচনা কেন?
‘ইউফোরিয়া’ ও ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এ অভিনয়ের পাশাপাশি সিডনি সুইনির পর্দার অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ‘ইউফোরিয়া’র কিছু দৃশ্য তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
তবে সিডনি জানিয়েছেন, চরিত্রের প্রয়োজনে এমন দৃশ্যে অভিনয় করতে তিনি ভবিষ্যতেও পিছপা হবেন না। তাঁর যুক্তি, তিনি একজন অভিনেত্রী এবং তাঁকে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়।
কৈশোর থেকেই অবশ্য নিজের শরীরের চেয়ে কাজ নিয়ে মানুষকে কথা বলাতে চেয়েছেন তিনি। এ কারণেই স্কুলে খেলাধুলা ও পড়াশোনায়ও নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন বলে জানিয়েছেন সিডনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক
শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, ক্যামেরার পেছনেও নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছেন সিডনি। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ফিফটি-ফিফটি ফিল্মস–এর মাধ্যমে ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ ও ‘ইম্যাকুলেট’-এর মতো প্রকল্পে প্রযোজকের ভূমিকায় ছিলেন তিনি।
অর্থাৎ, নিজের ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্তে ধীরে ধীরে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছেন এই অভিনেত্রী।
বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডের দুনিয়াতেও তাঁর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। আরমানি বিউটি, মিউ মিউ, লেনিজ, ফোর্ড, স্যামসাং ও আমেরিকান ইগলের মতো বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ২০২৫ সালে আমেরিকান ইগলের ‘Sydney Sweeney Has Great Jeans’ প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সামনে আরও বড় কাজ
সিডনি সুইনির সামনে এখন ব্যস্ত সময়। ‘ইউফোরিয়া’ ও ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’-এর সাফল্যের পর শুধু অভিনেত্রী হিসেবে নয়, প্রযোজক হিসেবেও নিজের অবস্থান শক্ত করছেন তিনি।
সামনের আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গানডাম’। নোয়াহ সেন্টিনিওর সঙ্গে এই হলিউড ছবিতে অভিনয় করছেন সিডনি এবং প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত তিনি।
এ ছাড়া ‘দ্য হাউসমেইডস সিক্রেট’-এ মিলি ক্যালোওয়ে চরিত্রে ফিরছেন তিনি। প্রথম ছবির পরবর্তী কিস্তিতে তাঁর সঙ্গে থাকছেন কার্স্টেন ডানস্ট।
এডিথ ওয়ার্টনের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য কাস্টম অব দ্য কান্ট্রি’তেও কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে তাঁকে। পাশাপাশি ‘স্ক্যান্ডালাস!’-এ কিংবদন্তি অভিনেত্রী কিম নোভাকের চরিত্রে অভিনয়ের জন্যও যুক্ত হয়েছেন তিনি।
গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এক কিশোরীর হলিউড জয়ের গল্পটা তাই এখনো শেষ হয়নি। বরং সিডনি সুইনির ক্যারিয়ারে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোই সামনে অপেক্ষা করছে।















