Image

গোপন রহস্য ফাঁস হতেই ‘নরমাল’ শহর অস্বাভাবিক, শুরু তুমুল বন্দুকযুদ্ধ

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 3 ঘন্টা আগেআপডেট: 38 মিনিট আগে
গোপন রহস্য ফাঁস হতেই ‘নরমাল’ শহর অস্বাভাবিক, শুরু তুমুল বন্দুকযুদ্ধ

গোপন রহস্য ফাঁস হতেই ‘নরমাল’ শহর অস্বাভাবিক, শুরু তুমুল বন্দুকযুদ্ধ

গোপন রহস্য ফাঁস হতেই ‘নরমাল’ শহর অস্বাভাবিক, শুরু তুমুল বন্দুকযুদ্ধ

বরফে ঢাকা ছোট্ট শহর। জনসংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৮৯০। অপরাধ বলতে তেমন কিছু নেই, মানুষজন হাসিমুখে কথা বলে, দোকানে নিত্যদিনের কেনাকাটা চলে, আর স্থানীয় মেয়রও বেশ বন্ধুবৎসল। এমন শহরে নতুন শেরিফের কাজই-বা কী?

উলিসিস রিচার্ডসনের (বব ওডেনকার্ক) কাছে কাজটা খুবই সহজ—কাগজপত্রে সই করা, ছোটখাটো ঝামেলা মেটানো এবং ছয় সপ্তাহের দায়িত্ব শেষ করে অন্য শহরে চলে যাওয়া। অন্তত তাঁর পরিকল্পনা এমনই ছিল।

শহরের নাম ‘নরমাল’ হলেও বাস্তবে এখানকার কিছুই স্বাভাবিক নয়। বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে লোভ, অস্ত্র, সহিংসতা, দুর্নীতি ও নানা গোপন হিসাব-নিকাশ। আর সেই অস্বাভাবিক জগতের মাঝখানে এসে পড়েন এমন এক শেরিফ, যিনি নিজের জীবন নিয়েই খুব একটা আশাবাদী নন।

বেন হুইটলির ‘Normal’ মূলত অ্যাকশন-কমেডি। তবে এর ভেতরে ছোট শহরের আমেরিকান জীবনের নানা অসংগতিকে ব্যঙ্গ করার চেষ্টাও রয়েছে। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন বব ওডেনকার্ক ও ডেরেক কোলস্টাড। অ্যাকশনপ্রেমীরা জানেন, কোলস্টাডই ‘John Wick’ ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ওডেনকার্কের ‘Nobody’ ছবিগুলোর চিত্রনাট্যকার।

তাই ‘Normal’ দেখতে বসলে ‘Nobody’ কিংবা ‘John Wick’-এর ছায়া চোখে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এবার ওডেনকার্কের চরিত্রটি অবসরপ্রাপ্ত গুপ্তঘাতক কিংবা সুপ্ত অ্যাকশন হিরো নন। অন্তত শুরুতে তিনি সত্যিই একজন সাধারণ মানুষ।

সাধারণ শেরিফ, অস্বাভাবিক শহর

উলিসিসের জীবনও খুব একটা স্বাভাবিক নয়। স্ত্রী থেকে আলাদা হয়ে আছেন। আগের কর্মস্থলে ঘটে যাওয়া একটি সহিংস ঘটনার বোঝাও বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজের কাজ ও জীবন সম্পর্কে তাঁর দর্শনও বেশ নির্লিপ্ত—জীবন সহজ হয়, যখন মানুষ একটু কম চিন্তা করে।

নরমাল শহরেও তাঁর লক্ষ্য খুব সাধারণ: যেভাবে শহরটিকে পেয়েছেন, সেভাবেই রেখে দায়িত্ব শেষ করে চলে যাওয়া।

এই ক্লান্ত, খানিকটা হতাশ, মধ্যবয়সী মানুষের চরিত্রটিই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। বব ওডেনকার্ক এখানে আবারও প্রমাণ করেছেন, গম্ভীর মুখে অস্বস্তিকর হাস্যরস ও সহিংস অ্যাকশনের মিশেল কতটা কার্যকর হতে পারে।

‘Better Call Saul’-এর শৌল গুডম্যান কিংবা ‘Nobody’-র হাচ ম্যানসেলের মতো এখানেও তাঁর চরিত্রটি ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায়। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে বারবার ঠেলে দেয় অ্যাকশনের দিকে। আর সেখানেই ওডেনকার্কের কমেডি ও অ্যাকশন অভিনয়ের সমন্বয় সবচেয়ে বেশি মজা দেয়।

রহস্য ধীরে ধীরে সামনে আসে

শুরুতেই বোঝা যায়, নরমাল শহরটি যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, আসলে ততটা নয়।

সদ্য মারা যাওয়া আগের শেরিফের মৃত্যু রহস্যজনক। তাঁর বাড়ি অস্বাভাবিক রকম বড়। পুলিশ বিভাগের অস্ত্রভান্ডারও ছোট শহরের তুলনায় বেমানান। হার্ডওয়্যার দোকানের তালাবদ্ধ ঘর, পুলিশ স্ক্যানার শুনতে থাকা বৃদ্ধা, স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁয় অস্বাভাবিক সংখ্যক বন্দুক—সবকিছু মিলিয়ে উলিসিসের সন্দেহ বাড়তে থাকে।

এরপর ব্যাংকে ডাকাতি করতে আসে দুই ‘হতভাগ্য অপরাধী’। শুরুতে ঘটনাটি সাধারণ ব্যাংক ডাকাতির মতো মনে হলেও খুব দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যায়।

শহরের মানুষ, পুলিশ এমনকি মেয়রও যেন একে একে উলিসিসের বিপক্ষে চলে যেতে থাকে। মুহূর্তেই ভদ্রতা উধাও হয়ে শুরু হয় বন্দুকযুদ্ধ।

আর এখান থেকেই ‘Normal’ তার আসল চেহারা দেখাতে শুরু করে।

বন্দুক, বিস্ফোরণ আর ব্ল্যাক কমেডি

বেন হুইটলি এর আগে ‘Free Fire’-এ সীমিত একটি জায়গার মধ্যে বন্দুকযুদ্ধকে অসাধারণ ব্ল্যাক কমেডিতে পরিণত করেছিলেন। ‘Normal’-এও তাঁর সেই পরিচিত মেজাজ ফিরে এসেছে।

বরফঝড়, পুলিশের গাড়ির আলো, বিস্ফোরণ, গুলি আর চারপাশে ছিটকে পড়া মানুষ—সব মিলিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বেশ উপভোগ্য।

কখনো রান্নাঘরের হাতিয়ার, কখনো শটগান, কখনো ভারী অস্ত্র—উলিসিসের হাতে যা আসে, সেটিই যেন অস্ত্র হয়ে ওঠে। আপাতনিরীহ চেহারার ওডেনকার্ককে কখনো খাবারের দোকানে ভয়ংকর মারামারি করতে, আবার কখনো বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা ছবিটির বড় ইউএসপি।

তাঁর গম্ভীর মুখ আর চারপাশের ভয়াবহ সহিংসতার বৈপরীত্যই বারবার হাসির জন্ম দেয়।

‘নরমাল’-এর ভেতরে আমেরিকার ব্যঙ্গ

ছবির সহিংসতা শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। ছোট শহরের গল্পের আড়ালে আমেরিকার কিছু বাস্তব প্রবণতাকেও অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামাজিক বিভাজন, অস্ত্রের প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তি এবং ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের মানসিকতা—সবকিছুরই ইঙ্গিত রয়েছে ছবিতে।

স্থানীয় বার ও রেস্তোরাঁর দেয়ালজুড়ে শত শত বন্দুক ঝোলানো। উলিসিস জানতে চান, সেগুলো কি সব লোড করা? উত্তর আসে হাসিমুখে—লোড করা না থাকলে তো মজাই নেই।

এই ধরনের দৃশ্যই ‘Normal’-এর কমেডির ধরনটি বুঝিয়ে দেয়। এখানে বেশির ভাগ সময় জোর করে হাসানোর চেষ্টা নেই। বরং অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে দৃশ্যগুলো আরও মজার হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক ইঙ্গিতও রয়েছে। আগের শেরিফের কিশোর সন্তান অ্যালেক্সের (জেস ম্যাকলয়েড) গল্পের মাধ্যমে শহরের মানুষের নিয়ন্ত্রণপ্রবণতা ও সামাজিক বিভাজন সামনে আসে। অস্ত্র, আত্মরক্ষা, সামরিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণও গল্পের ভেতরে জায়গা করে নেয়।

তবে ‘Normal’ এসব নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেয় না। অনেক সময় গুলির শব্দই সংলাপের জায়গা নিয়ে নেয়।

‘Fargo’-র কথা মনে পড়বেই

ছবিটি দেখার সময় ‘Fargo’-র কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। তুষারে ঢাকা মিনেসোটা, শান্ত ছোট শহর, অদ্ভুত সব মানুষ এবং অপরাধের আড়ালে থাকা গোপন জগত—দুই ছবির মধ্যে মিল রয়েছে।

আগের শেরিফের নামও গন্ডারসন, যা ‘Fargo’-র শেরিফ চরিত্রের নামের সঙ্গে স্পষ্টভাবে মিল তৈরি করে।

তবে ‘Normal’ ‘Fargo’-র মতো ডার্ক কমেডির টোন পুরোপুরি অনুসরণ করে না। বরং এটি ‘John Wick’-এর অতিরঞ্জিত অ্যাকশন আর ‘Free Fire’-এর উন্মত্ততার দিকে বেশি ঝুঁকে যায়।

কোথায় পিছিয়ে ‘Normal’?

ছবিটির কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট।

এতগুলো চরিত্র ও গল্পের উপকরণ হাজির করা হলেও সবগুলোর যথেষ্ট বিকাশ হয়নি। উলিসিসের অতীত, ভেঙে যাওয়া সংসার, আগের চাকরির ট্র্যাজেডি, অ্যালেক্সের গল্প কিংবা স্থানীয় কয়েকটি চরিত্র—সবকিছুর মধ্যেই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু প্রায় ৯০ মিনিটের ছবিতে অনেক কিছুই দ্রুত ছুঁয়ে চলে যাওয়া হয়েছে।

ফলে কিছু আবেগঘন মুহূর্ত প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে পারে না। কমেডিও সব সময় সমান কার্যকর নয়—কিছু দৃশ্য দারুণ, আবার কিছু বেশ পরিচিত মনে হয়।

আরেকটি সমস্যা হলো, ছবির বেশ কিছু চমক আগে থেকেই অনুমান করা যায়। তবে ‘Normal’ এমন সিনেমা নয়, যা শুধু রহস্যের সমাধান জানার জন্য দর্শককে আটকে রাখে।

এর আসল আনন্দ হলো—গল্পের চমকগুলোকে কীভাবে রক্তাক্ত, অদ্ভুত ও হাস্যকর অ্যাকশনে পরিণত করা হচ্ছে।

শেষ কথা

অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে ‘Normal’ খুব বেশি নতুন কিছু দিতে পারেনি। তবে ডার্ক কমেডি, রোমাঞ্চ, অতিরঞ্জিত অ্যাকশন এবং বব ওডেনকার্কের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে ছবিটি মোটের ওপর উপভোগ্য।

শহরের নাম ‘নরমাল’, কিন্তু শহরের মানুষ, তাদের অস্ত্র আর গোপন জীবন—কিছুই স্বাভাবিক নয়। আর সেই অস্বাভাবিকতার মাঝখানে একজন অনিচ্ছুক শেরিফকে দাঁড় করিয়েই বেন হুইটলি তৈরি করেছেন ছবিটির মূল মজা।

রেটিং: ৭/১০

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three