Image

রাজাউল্লাহর আগমনে এজবাস্টনে বদলে গেল পাকিস্তানের গল্প

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ : 2 ঘন্টা আগেআপডেট: 8 মিনিট আগে
রাজাউল্লাহর আগমনে এজবাস্টনে বদলে গেল পাকিস্তানের গল্প

রাজাউল্লাহর আগমনে এজবাস্টনে বদলে গেল পাকিস্তানের গল্প

রাজাউল্লাহর আগমনে এজবাস্টনে বদলে গেল পাকিস্তানের গল্প

এজবাস্টনে পাকিস্তানের জন্য সিরিজটা ছিল হতাশা, বিতর্ক আর একের পর এক ধাক্কায় ভরা। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই যেন হঠাৎ জ্বলে উঠল একটি নতুন নাম—রাজাউল্লাহ মাসওয়ানি

২১ বছরের এই তরুণ টেস্ট অভিষেকেই এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, যা শুধু পাকিস্তানের সমর্থকদেরই নয়, ইংল্যান্ডের দর্শকদেরও মুগ্ধ করেছে। বল হাতে গতি, ব্যাট হাতে ভয়ডরহীনতা আর মাঠে এক ধরনের সহজাত আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে রাজাউল্লাহকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক ক্রিকেট-আলোচনা। মাইকেল আথারটনের দেওয়া নামটিও তাই বেশ মানানসই—‘রাজবল’

পাহাড়ি শহর থেকে এজবাস্টন

রাজাউল্লাহর জন্ম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার আপার দির জেলার নেহাগ দারায়। মাত্র দুই বছর বয়সেই পরিবারের সঙ্গে চলে যান মারদানে। পাহাড়ঘেরা সেই কঠিন পরিবেশেই বেড়ে ওঠা রাজাউল্লাহর ক্রিকেটের শুরুটাও ছিল বেশ সাধারণ।

আট ভাই-বোনের পরিবারে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেওয়ার অনুমতি সহজে মেলেনি। বড় ভাইকে দেখে রাজাউল্লাহও পরিবারের অগোচরে টেপ টেনিস খেলতে শুরু করেন।

কিন্তু শক্তিশালী কবজি আর বড় শট খেলার ক্ষমতা প্রতিভাকে বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারেনি।

টেপ টেনিসই হয়ে ওঠে তাঁর ক্রিকেটের প্রথম পাঠশালা।

ক্রিকেট বলে হাতেখড়ি, এরপর দ্রুত উত্থান

মারদানের আকমল খান ক্রিকেট একাডেমিতে রাজাউল্লাহর প্রতিভা প্রথম নজরে আসে। একাডেমির প্রধান এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার আকমল খান তাঁকে ক্রিকেট বলের সঙ্গে পরিচিত করে তোলেন।

২০২৩ সালে আন্তজেলা অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন রাজাউল্লাহ। এরপর জায়গা করে নেন অ্যাবোটাবাদ আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব-১৯ দলে।

আকমল খানের চোখে তাঁর প্রথম অনূর্ধ্ব-১৯ ম্যাচের স্মৃতিটাও বিশেষ। অভিষেক ম্যাচেই রাজাউল্লাহ ছিলেন দলের সেরা পারফরমারদের একজন।

এরপর মারদান জেলা দলে জায়গা পেতে বেশি সময় লাগেনি। মাঝে হাতের চোট তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই বিরতিও তাঁর পথচলা আটকে রাখতে পারেনি।

এজবাস্টনে সুযোগটা এল হঠাৎ

ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানের অবস্থা তখন বেশ নাজুক। প্রথম দুই টেস্টে হার, দলের ভেতরের নানা পরিবর্তন এবং সাত খেলোয়াড়কে দেশে পাঠানোর ঘটনায় পরিস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর।

এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টেস্টের আগে নতুন করে সাতজনকে দলে ডাকা হয়। তাঁদেরই একজন ছিলেন রাজাউল্লাহ।

মাত্র আটটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা এই তরুণ তখন ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমি থেকে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে ফিরেছিলেন। হঠাৎই আসে ইংল্যান্ড যাওয়ার ডাক।

রাজাউল্লাহর নিজের ভাষায়, ফজরের নামাজের পরপরই এনসিএ থেকে ফোন করে তাঁকে দ্রুত সেখানে যেতে বলা হয়। ইংল্যান্ডে পাঠানোর জন্য তাঁকে ডাকা হয়েছে—সেটিও নাকি তখন জানতেন না।

সেখান থেকেই শুরু নতুন অধ্যায়।

বল হাতে গতি, ব্যাট হাতে বিস্ময়

এজবাস্টনে বল হাতে রাজাউল্লাহর গতি প্রথমেই নজর কাড়ে। ঘণ্টায় প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করার সামর্থ্য দেখিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, পাকিস্তান শুধু একজন নতুন বোলার পায়নি—পেয়েছে সম্ভাবনাময় এক পেসার।

কিন্তু আসল বিস্ময় অপেক্ষা করছিল ব্যাট হাতে।

পাকিস্তান যখন ইনিংস পরাজয় এড়াতে মাত্র দুই রান দূরে, তখন নয় নম্বরে ব্যাট করতে নামেন রাজাউল্লাহ। এমন পরিস্থিতিতে একজন অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান সাধারণত টিকে থাকার চেষ্টা করেন। রাজাউল্লাহ বেছে নিলেন আক্রমণ।

জফরা আর্চার, গাস অ্যাটকিনসনদের মতো পেসারদের বিপক্ষেও তাঁর ব্যাট থামেনি।

অ্যাটকিনসনের এক ওভারেই মারেন তিনটি ছক্কা। আর্চারের বলেও আসে বড় ছক্কা। পেছনের পায়ে ভর করে লেগ সাইডের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেওয়ার ধরনটিতে স্পষ্ট ছিল তাঁর টেপ টেনিস ক্রিকেটের ছাপ।

কিন্তু শুধু টেপ টেনিস নয়, এই ব্যাটিংয়ের পেছনে ছিল আরও বড় একটি শক্তি—ভয়ডরহীন সাহস

৬৩ বলে ৮১—অভিষেকেই ইতিহাস

শেষ পর্যন্ত রাজাউল্লাহর ইনিংস থামে ৬৩ বলে ৮১ রানে। চারটি চার ও নয়টি ছক্কায় সাজানো সেই ইনিংস পাকিস্তানকে শুধু ইনিংস পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচায়নি, ম্যাচে লড়াই করার সুযোগও এনে দেয়।

টেস্ট অভিষেকে নয়টি ছক্কা মেরে তিনি সমান করেন নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদির রেকর্ড। ২০০৮ সালে অভিষেক টেস্টে সাউদিও নয়টি ছক্কা মেরেছিলেন।

রাজাউল্লাহর ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তাঁর শটের ধরন। বিশেষ করে আর্চার ও অ্যাটকিনসনের বিপক্ষে তাঁর শক্তিশালী হিটিং এবং ব্যাটের শব্দ দর্শকদের আলাদা করে নজর কাড়ে।

এলবিডব্লিউ রিভিউয়ে বেঁচে ওঠার মুহূর্ত

রাজাউল্লাহর ইনিংসের শেষদিকে আসে আরও একটি স্মরণীয় দৃশ্য।

মাইকেল লরেন্সের বলে এলবিডব্লিউয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নেওয়া হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, তিনি বেঁচে গেছেন। পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমে তখন যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, তা যেন একটি উইকেট বাঁচানোর চেয়েও অনেক বড় কোনো অর্জন।

পরের বলেই অবশ্য আক্রমণাত্মক শট খেলতে গিয়ে স্টাম্পড হয়ে ফিরে যান রাজাউল্লাহ।

কিন্তু ততক্ষণে তিনি কাজের কাজটি করে ফেলেছেন।

হারের মাঝেও জন্ম নিল নতুন তারকা

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান এজবাস্টন টেস্টেও হেরেছে এবং সিরিজে ধবলধোলাই হয়েছে। দলের জন্য ফলাফল ছিল হতাশার।

কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে রাজাউল্লাহর গল্পটা একেবারেই আলাদা।

তৃতীয় দিনে ৮১ রানের ইনিংস শেষ করে যখন তিনি মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন এজবাস্টনের দর্শকেরা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান। পাকিস্তানের পুরো দল যে সম্মান পায়নি, সেই সম্মান পেয়েছেন অভিষিক্ত এই তরুণ।

এমনকি পরের স্পেলগুলোতে বোলিং করতে নামার সময়ও গ্যালারি থেকে এসেছে করতালি।

সেই করতালিই হয়তো বলে দিয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা—পাকিস্তান একটি টেস্ট ম্যাচ হারেছে, একটি সিরিজ হেরেছে; কিন্তু সেই হারের মধ্যেই তারা খুঁজে পেয়েছে একজন নতুন তারকাকে।

নাম তাঁর রাজাউল্লাহ মাসওয়ানি।
ক্রিকেটের নতুন ডাকনাম—‘রাজবল’

Details Bottom
Details ad One
Details Two
Details Three