‘সার্ফিং করে কালো হয়ে গেছ, বিয়ে কে করবে?’ - ফাতেমা আক্তার
- 1
আর্চার-টাংদের পেস আক্রমণে ২০০৫ অ্যাশেজজয়ী দলের ছায়া দেখছেন ট্রেসকোথিক
- 2
‘তুমি অমর’—মেসির বিদায়ে আবেগে ভাসলেন মার্তিনেজ, দি পল ও সতীর্থরা
- 3
অশ্রুসিক্ত বিদায়: আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় বললেন লিওনেল মেসি
- 4
এমবাপ্পের গোলে রিয়ালের জয়
- 5
নতুন পে স্কেলে এমপিও শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

‘সার্ফিং করে কালো হয়ে গেছ, বিয়ে কে করবে?’ - ফাতেমা আক্তার
‘সার্ফিং করে কালো হয়ে গেছ, বিয়ে কে করবে?’ - ফাতেমা আক্তার
কক্সবাজরের লাবনী বিচের ঢেউ পেরিয়ে এবার ইতিহাসের পথে বাংলাদেশের ফাতেমা আক্তার। দেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে জাপানের আইচি নাগোয়ায় হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে যাচ্ছেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে গড়ে তোলা স্বপ্ন এবার তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চে। ফাতেমার এই যাত্রা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দেশের নারী সার্ফিংয়ের জন্যও নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি, স্বপ্ন, চ্যালেঞ্জ এবং নিজের লক্ষ্য নিয়ে ১৬ বছরের এই সার্ফার কথা বলেছেন টি-স্পোর্টসের সঙ্গে।
টি-স্পোর্টস: এশিয়ান গেমসে প্রথমবার অংশ নিচ্ছেন। যখন শুনলেন জাপানে যাচ্ছেন, অনুভূতি কেমন ছিল?
ফাতেমা আক্তার:আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে জাপানে যাব। যখন শুনেছি, তখন খুব ভালো লেগেছে। আমার পরিবারও অনেক খুশি হয়েছে। মনে হচ্ছে, এর মাধ্যমে সার্ফিংকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। তবে একটা বিষয় খারাপ লাগছে— যিনি আমাদের সার্ফিং শিখিয়েছেন, আমাদের সেই কোচ (রাশেদ আলম) জাপানে যেতে পারছেন না। লাইফগার্ড যাবেন কি না, সেটাও আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না।
টি-স্পোর্টস: সার্ফিংয়ে আসার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
ফাতেমা আক্তার:আগে আমি জানতামই না সার্ফিং কী। বিচে গিয়েছি, কিন্তু সার্ফিং দেখিনি। আমি পড়াশোনা করতাম। আমাদের কয়েকজন বন্ধু প্রতিদিন বিচে যেত এবং ঝিনুক বিক্রি করত। আমি জিজ্ঞেস করতাম, তোমরা প্রতিদিন কোথায় যাও? তারা বলত, সার্ফিং করতে যাই। আমি জানতে চাইতাম, এগুলো কী? তারা বলত, আমাদের সঙ্গে গেলে দেখতে পারবে। একদিন তাদের সঙ্গে লুকিয়ে সার্ফিং করতে চলে যাই।
টি-স্পোর্টস: পরের গল্পটা কেমন ছিল?
ফাতেমা আক্তার: প্রথমবার পানিতে নামার সময় অনেক ভয় লাগছিল। বন্ধুরা বলেছিল, প্রথমবার ভয় লাগবে, আমাদেরও ভয় লেগেছিল। পরে বাসায় আসার পর আম্মু জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোথায় গিয়েছিলাম। প্রথমে তাঁকে বলিনি। পরে যখন বললাম যে আমি সার্ফিং করতে যাব, আম্মু জানতে চাইলেন, এগুলো কী, কোথায় যেতে হবে। তিনি বলেছিলেন, বিচে গেলে মানুষ কী বলবে? এসব বলার পর প্রায় এক সপ্তাহ সার্ফিংয়ে যাইনি। পরে আবার আম্মুকে বলে সার্ফিংয়ে যাওয়া শুরু করি, কোচ এসে আম্মুকে বোঝায়।
টি-স্পোর্টস : মা ছাড়া আপনার পরিবারে আর কে কে আছেন?
ফাতেমা আক্তার:আমার বাবা নেই। আমরা তিন বোন ও এক ভাই।
টি-স্পোর্টস: তখন কোন ক্লাসে পড়তেন?
ফাতেমা আক্তার:২০২০ সালে আমি ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। এখন ক্লাস টেনে পড়ি।
টিস্পোর্টস: ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় সমুদ্রে নেমে গেলেন, ভয় কাজ করতো না?
ফাতেমা আক্তার:খুব ভয় লাগত। আমি কান্না করে দিয়েছিলাম। পানিতে পড়ে যাওয়ার পর সার্ফবোর্ডটি আমার মাথার ওপর ছিল। আমি কান্না করে দিয়েছিলাম এবং আর নামতে চাইনি। পরে বান্ধবীরা আমাকে উৎসাহ দেওয়ায় আবার পানিতে নামি। আমরা তখন প্রায় ১০-১২ জন মেয়ে ছিলাম। সবাই ভালোভাবে সার্ফিং করত।
টি-স্পোর্টস: সার্ফিংয়ের শুরুটা কোথায় হয়েছিল?
ফাতেমা আক্তার: বিচে। আমরা ক্লাবে আসতাম। ক্লাব থেকেই আমাদের পানিতে নিয়ে যাওয়া হতো। লাবণী পয়েন্টে আমরা সার্ফিং করতাম।
টি-স্পোর্টস: সার্ফিংয়ে আসার আগে সাঁতার জানতেন?
ফাতেমা আক্তার:না, আমি সাঁতার জানতাম না। প্রথমে পানিতে নেমে ভয় পেয়েছিলাম। পরে সাঁতার শিখেছি। সার্ফিং করার আগে ক্লাব থেকেই সবাইকে সাঁতার শেখানো হয়। এখন আমরা সাঁতার পারি।
টি-স্পোর্টস: প্রথমদিকের ভয় কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস কখন পেলেন?
ফাতেমা আক্তার:যখন নিজে নিজে সার্ফবোর্ড নিয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম, তখন আত্মবিশ্বাস বাড়তে শুরু করে। এরপর সবার সঙ্গে মাঝসমুদ্রে যেতে শুরু করি। পরে আমাকে ভালো একটি সার্ফবোর্ড দেওয়া হয়। তখন আরও ভালো লাগতে শুরু করে। সার্ফিং নিয়ে আমি আগে তেমন স্বপ্ন দেখিনি। কারণ সার্ফিং যে এত বড় একটি খেলা, তা আমি জানতাম না। পরে ভারতে গিয়ে সার্ফিং সম্পর্কে আরও জানতে পারি।
টি-স্পোর্টস: সার্ফিং নিয়ে কি কখনো মানুষের কাছ থেকে নেতিবাচক কথা শুনতে হয়েছে?
ফাতেমা আক্তার: হ্যাঁ, অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অনেকে বলত, ‘কালো হয়ে গেছ, বিয়ে কে করবে?’ আরও বলত, মেয়েরা কেন সার্ফিং করতে যায়, ছেলেরা গেলে ঠিক আছে। এসব অনেক কথা শুনতে হয়েছে। আমার আম্মুকেও সমাজের মানুষ এসব কথা বলত। স্কুলেও অনেকে বলত, তুমি কালো হয়ে গেছ, এসব কেন করছ। আমি চুপ করে থাকতাম। কারণ তারা তো সার্ফিং কী, সেটাই জানে না।
টি-স্পোর্টস: কখন থেকে পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন?
ফাতেমা আক্তার:আমার বাবা নেই। ছোট থাকতেই বাবা মারা গেছেন। আমি বাবাকে দেখিনি। আমার আম্মু বাসাবাড়িতে কাজ করেন এবং আমাদের সংসার চালান।একসময় আমি সার্ফিং ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কারণ এত খরচ চালানো আমাদের পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। আমরা তিন বোন, আমার ভাইও আছে। তখন রাশেদ ভাই বাসায় গিয়ে বলেছিলেন, আমার পড়াশোনার খরচসহ প্রয়োজনীয় খরচ তিনি বহন করবেন। ক্লাব থেকে বাসায় যাতায়াতের খরচও তিনি দিতেন। আমরা কয়েকজন মেয়ে একসঙ্গে সার্ফিং করতাম। তাদের মধ্যে মিলিও ছিল। এখন অনেকেই বিয়ে করে ফেলেছে।
টি-স্পোর্টস: এখন আপনি এশিয়ান গেমসে যাচ্ছেন। একসময় সামাজিক যে বাধাগুলো ছিল, সেগুলো পেরিয়ে এখন কেমন লাগছে?
ফাতেমা আক্তার:এখন এসব নিয়ে আর ভাবি না।একসময় ভাবতাম, কালো হয়ে যাচ্ছি, মানুষ কী বলবে—এসব নিয়ে চিন্তা করতাম। পরে যখন আমার স্বপ্ন তৈরি হয়েছে যে আমি বড় হব, সার্ফিং নিয়ে এগিয়ে যাবো, সার্ফিং অন্যান্য খেলার মতো গুরুত্ব পাবে একদিন, তখন এসব আর ভাবি না। আমার গায়ের রং কেমন, আমি কে— এসব নিয়ে এখন চিন্তা করি না।
টি-স্পোর্টস: খেলোয়াড় হিসেবে পুষ্টিকর খাবার ও ফিটনেসের বিষয়গুলো কীভাবে সামলাতেন?
ফাতেমা আক্তার: অনেক সময় খাবারের সমস্যা হতো। কখনো কখনো না খেয়েই বাসায় চলে আসতাম। কোচকে প্রতিদিন তো এসব বলতে পারতাম না। আমাদের অনেক ছেলে-মেয়ে আছে, তারপরও ভাইয়া যতটা সম্ভব সহযোগিতা করতেন। আমরা সকালে ও বিকেলে সার্ফিং করি, বিশেষ করে স্কুল না থাকলে। এরপর বাসায় গিয়ে ভাত খাই। পরে রাশেদ ভাই খাবারের প্যাকেট এবং বাজার— চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়ার কথা বললে আম্মু আমাকে সার্ফিং করতে যেতে দেন।
টি-স্পোর্টস: আপনি কি মনে করেন, সার্ফিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ভবিষ্যতে পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব?
ফাতেমা আক্তার:ইনশাআল্লাহ, পারব। আপনারা পাশে থাকলে অবশ্যই সম্ভব। আমাদের দেশে এখনও অনেক মানুষ সার্ফিং সম্পর্কে জানে না। অনেকে যদিও মেয়েদের সার্ফিংকে খারাপভাবে দেখে।
টি-স্পোর্টস: আপনি তো এখন অন্য মেয়েদের জন্যও পথ দেখাচ্ছেন। যারা নতুন করে সার্ফিং করতে চায়, তাদের জন্য কী বলবেন?
ফাতেমা আক্তার: আমি যখন জাপানে এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে অংশ নেব, ইনশাআল্লাহ আরও অনেক মেয়ে সার্ফিং করবে। আমি চাই, আরও অনেক মেয়ে এই খেলায় এগিয়ে আসুক।
টি-স্পোর্টস: সার্ফিং ফেডারেশনের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা পেলে নিজেকে আরও উন্নতি করতে পারতেন?
ফাতেমা আক্তার:অ্যাসোসিয়েশন থেকে যদি আমরা আরও সহযোগিতা পেতাম, তাহলে অনেক এগিয়ে যেতে পারতাম। এখন আমাদের ফোন দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এর আগে তেমন কোনো ফোন বা খোঁজখবর নেয়নি। আমরা যখন জাপানে যাওয়ার জন্য কোয়ালিফাই করেছি, তখন আমাদের খোঁজ নেওয়া শুরু হয়েছে। সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন ছিল, কিন্তু আমরা সেভাবে সহযোগিতা পাইনি।
টি-স্পোর্টস: এশিয়ান গেমসে আপনার প্রত্যাশা কী?
ফাতেমা আক্তার:আমার অনেক স্বপ্ন। বিদেশে গিয়ে সার্ফিং করতে চাই এবং বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। মেয়েরাও পারে— এটা প্রমাণ করতে চাই। ইনশাআল্লাহ, সেখানে ভালো করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
ফাতেমার কোচ রাশেদ আলম যা বলছেন
২০১৩ সালে কক্সবাজারে আমি সার্ফিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করি। প্রায় সাত বছর হলো ফাতেমার সঙ্গে পরিচয়। বিচে ওর বান্ধবীরা ঝিনুক বিক্রি করত, ওদের সঙ্গেই আসত। পরে ওকে আমি সার্ফিংয়ের কথা বলি, কিন্তু শুরুতে পরিবারের পক্ষ থেকে সম্মতি দেয় না। এরপর ওর পড়াশোনাসহ সব খরচের দায়িত্ব নিই। ওর মধ্যে আমি অনেক সম্ভাবনা দেখি, সুযোগ-সুবিধা দিতে পারলে, বিশেষকরে বিদেশে নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে সাহস বা আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেতো। ফেডারেশন থেকে সে অর্থে লজিস্টিক সহায়তা দিতে পারছে না, দিতে পারলে আরও এগিয়ে যাওয়া যেতো।
সার্ফিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন রোকনের কথা
নতুন খেলা হওয়া সত্ত্বেও এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অর্জিত র্যাঙ্কিংয়ের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু প্রচারের অভাবে সার্ফিংয়ে কোনো স্পন্সর পাওয়া যায়নি। এতদিন নিজেদের খরচে টুর্নামেন্ট ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রের ঢেউ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় ছোট। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ বা ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় ঢেউয়ের দেশে নিয়ে উন্নত ট্রেনিং দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক অভাবে তা সম্ভব হয়নি। এবং আমাদের মান্নান, ফাতেমা ও মিলিসহ সেরা ১০ জন সার্ফার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফাইট করার মতো দক্ষ ও সাহসী। মান্নান বেশ অভিজ্ঞ এবং ফাতেমা নতুন হলেও তাদের ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে।















